ঢাকা সোমবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ , ২৩ মাঘ ১৪২৯ আর্কাইভস ই পেপার

ব্যাংকের ভল্টে  মিলেছে জাল নোট

অর্থনীতি

আমাদের বার্তা প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২:৫২, ২৮ নভেম্বর ২০২২

সর্বশেষ

ব্যাংকের ভল্টে  মিলেছে জাল নোট

যমুনা ব্যাংকের ভল্টে মিলেছে জাল নোট। এ ছাড়া ছেঁড়া-ফাটা, অন্য নোটের অংশ জোড়া, অন্য শাখা থেকে ফেরত দেওয়ার সিলযুক্ত ও বহু খণ্ডে খণ্ডিত প্রচলনের অযোগ্য নোটও পাওয়া গেছে। সম্প্রতি যমুনা ব্যাংকের বগুড়ার শেরপুর এসএমই শাখায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে এমন গুরুতর অনিয়ম পেয়েছেন। ৫০০ টাকার জাল নোট পাওয়া গেছে সাতটি আর প্রচলনের অযোগ্য নোট ছিল ৪৫৫টি। এক শাখায় এত সংখ্যক জাল ও বাতিল নোট পাওয়ার ঘটনা সচরাচর ঘটে না। এরই মধ্যে ঘটনার সঙ্গে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ঢাকা-বগুড়া হাইওয়ের পাশে জব্বার টাওয়ারে যমুনা ব্যাংকের শেরপুর শাখা। মূলত এসএমই ঋণ-সংক্রান্ত পরিদর্শনের জন্য এ শাখায় যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বগুড়া অফিসের পরিদর্শক দল। গত ৭ সেপ্টেম্বর তিন সদস্যের পরিদর্শক দল ব্যাংকিং শুরুর আগেই হাজির হয়ে ভল্টের হিসাব মেলাতে গিয়ে জাল ও বাতিল নোট পায়। অনিয়মের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য গত ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠায় বগুড়া কার্যালয়। এর পর প্রধান কার্যালয় থেকে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মির্জা ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদকে সম্প্রতি চিঠি দেওয়া হয়েছে।

ব্যবহার অযোগ্য নোটের মধ্যে ৩৬৯টি ৫০০ টাকা এবং ৮৬টি ১০০ টাকা মূল্যমানের। সব মিলিয়ে এসব নোটের মোট মূল্যমান ১ লাখ ৯৩ হাজার ১০০ টাকা। অন্য শাখার 'পেমেন্ট রিফিউজড' বা প্রচলনের অযোগ্য সিলযুক্ত ২২টি নোট পাওয়া গেছে। আলাদা একটি নোটের অংশ কেটে জোড়া লাগানো বা বিল্টআপ নোট ছিল ২১৫টি। নোটের দুই পাশে নম্বরের মিল নেই এমন নোট ছিল ২০টি। আর বহু খণ্ডে খণ্ডিত নোট ছিল ১৯১টি।

এ ব্যাপারে বক্তব্যের জন্য মির্জা ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদের ব্যক্তিগত মোবাইল ও হোয়াটসঅ্যাপে টেলিফোন ও সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করে বার্তা দেওয়া হয়। তবে তিনি সাড়া দেননি। টেলিফোনে জানতে চাইলে যমুনা ব্যাংকের বগুড়ার শেরপুর শাখার ব্যবস্থাপক আহসানুল হক বলেন, এক মাস হলো তিনি এ শাখায় যোগদান করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে জাল ও ছেঁড়া-ফাটা নোট পাওয়ার ঘটনা তিনি শুনেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনার ফলেই আগের ব্যবস্থাপককে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, যমুনা ব্যাংকের এ শাখার ভল্টে টাকা রাখার সীমা ২ কোটি ৬০ লাখ। শাখা ব্যবস্থাপকসহ ১৫ জন এখানে কর্মরত। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন তারিখের দেড় বছর আগে থেকে শাখার ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে ছিলেন গোলাম ফিরোজ। তাঁকে এ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে সেকেন্ড অফিসারের দায়িত্বে বহাল করা হয়েছে। আর সেকেন্ড অফিসারের দায়িত্বে থাকা সানাউল্লাহ মিয়াকে রাজশাহী বদলি করা হয়েছে। এর বাইরে সবাই যে যাঁর দায়িত্বে বহাল আছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, অসতর্কতাবশত এত বাতিল নোট একটি শাখায় জমা থাকার কথা নয়। কোনো কারণে দু-একটি প্রচলনের অযোগ্য নোট চলে এলেও তা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানোর কথা। যমুনা ব্যাংকের শেরপুর শাখায় কেন এমন ঘটল, তা দুশ্চিন্তার বিষয়। প্রতিদিন লেনদেন শুরু ও শেষে শাখার ভল্টের হিসাব মেলানোর দায়িত্ব শাখা ব্যবস্থাপক, অপারেশন ম্যানেজার (সেকেন্ড অফিসার) ও ক্যাশ ইনচার্জের। কোন মূল্যমানের কত নোট এবং এসব নোট প্রচলনের যোগ্য কিনা তা দেখে লেজার বুকে হিসাব রাখতে হয়।

বিদ্যমান নিয়মে গ্রাহকের সঙ্গে লেনদেনের সময় বাধ্যতামূলকভাবে জাল নোট শনাক্তকারী মেশিনে চেক করে নিতে হয়। অপ্রচলনযোগ্য ছেঁড়া-ফাটা নোট বিনিময়েরও বিভিন্ন বিধান রয়েছে। কোনো অবস্থায় ব্যাংক শাখা জাল, বিল্টআপ, মিসম্যাচড ও অন্য শাখার পেমেন্ট রিফিউজড সিলযুক্ত নোটের বিনিময় মূল্য দিতে পারবে না। বরং এ ধরনের নোট বহনকারীকে নিয়ে সন্দেহ হলে তাৎক্ষণিকভাবে শাখা থেকে পুলিশে খবর দিয়ে তাকে ধরিয়ে দিতে হবে। আর যদি মনে হয়, গ্রাহক না বুঝে নিয়েছেন তাহলে তাঁকে সতর্ক করে ছেড়ে দিতে হবে। প্রতিটি ব্যাংকের ভল্টের একটি ধারণক্ষমতা নির্ধারিত আছে। কোনো কারণে নির্ধারিত সীমার বেশি নোট জমা হলে তা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকে টাকা জমার সময় পুনঃপ্রচলনযোগ্য ও অপ্রচলনযোগ্য নোট আলাদা করে জমা দিতে হয়। পুনঃপ্রচলনযোগ্য নোট বলতে বাজারে থাকা ফ্রেশ নোটকে বোঝানো হয়। আর অপ্রচলনযোগ্য বলতে অনেক ছেঁড়া, ফাটা, অনেক দাগানো বা কালিযুক্ত, অংশবিশেষ পোড়া বা এ ধরনের অন্য সমস্যাযুক্ত নোটকে বোঝানো হয়।

এর আগে একটি ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো বান্ডিলে জাল নোট পাওয়ায় গত বছর ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করে সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বরের ওই সার্কুলারে বলা হয়, পুনঃপ্রচলনযোগ্য নোটের প্যাকেটে জাল নোট পাওয়া যাচ্ছে। অনেক সময় যে পরিমাণ নোটের কথা বলা হচ্ছে, গুনে পাওয়া যাচ্ছে তার কম। আবার উচ্চ মূল্যমানের নোটের প্যাকেটে কম মূল্যমানের নোট বা ছেঁড়া নোটের অংশ নিখুঁতভাবে জোড়া দিয়ে পুনঃপ্রচলন নোট হিসেবে পাঠানো হচ্ছে। ফলে প্যাকেট বান্ডিল করার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখার নাম, সিল, নোট গণনাকারীর স্বাক্ষর ও তারিখ দিয়ে এর পর বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়।

জাল নোটের যত মামলা: চলতি বছরের শুরু থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জাল নোট-সংক্রান্ত ৯৪টি নতুন মামলা হয়েছে। আর নিষ্পত্তি হয়েছে ১২৫টি। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১০ বছরে জাল নোট-সংক্রান্ত ২ হাজার ৪৪৮টি নতুন মামলার বিপরীতে ৯৩২টি নিষ্পত্তি হয়েছে। সব মিলিয়ে ক্রমপুঞ্জীভূত অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৮৪৫টি। জাল নোট বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে মামলা হলেও শাস্তি হয় কম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাক্ষীর অভাবে অপরাধ প্রমাণ করা যায় না। এসব বিষয় মাথায় রেখে সাক্ষীর ক্ষেত্রে শিথিলতা এবং অপরাধের ধরন বুঝে শাস্তি বাড়ানোর জন্য আলাদা একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ২০১৭ সালে 'জাল মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ আইন' নামে আইনের খসড়া প্রণয়ন হলেও এখনও তা আলোর মুখ দেখেনি।

জনপ্রিয়