ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০২৪ , ৭ শ্রাবণ ১৪৩১ আর্কাইভস ই পেপার

nogod
nogod
bkash
bkash
uttoron
uttoron
Rocket
Rocket
nogod
nogod
bkash
bkash

কোরবানি হোক স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য

মতামত

রাজু আহমেদ

প্রকাশিত: ০০:১০, ১৬ জুন ২০২৪

সর্বশেষ

কোরবানি হোক স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য

জুনের ১৭ তারিখে দেশে অনুষ্ঠিত হবে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের দ্বিতীয় বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। কোরবানি শব্দের শাব্দিক অর্থ উৎসর্গ বা ত্যাগ করা। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখের যেকোনো দিন ইসলামি শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত জন্তুকে জবেহ করাকে কোরবানি বলা হয়। নিঃসন্দেহে কোরবানি মুসলমানদের পক্ষ থেকে আল্লাহর প্রতি অগাধ প্রেম ও অনুপম আনুগত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিশ্বের প্রায় ১৭৫ কোটি মুসলিম ব্যাপক ধর্মীয় উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালন করবে তাদের এ পবিত্র উৎসবটি। আল্লাহর অপার অনুগ্রহে ধনী-গরির মুসলমানরাও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঈদ আনন্দ উদযাপন করবে। মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর মাধ্যমে আমরা ঈদুল আজহাকে আমাদের ধর্মীয় উৎসব হিসেবে পেয়েছি।

ঐতিহাসিক সে ঘটনাটির সারসংক্ষেপ হলো, তখন ইব্রাহীম (আ.) এর নবুয়তের জীবন চলছিলো। মহান আল্লাহ ‘য়ালা হযরত ইব্রাহীমকে (আ.) স্বপ্নের মাধ্যমে আদেশ করলেন তার প্রিয় বস্তুকে আল্লাহর উদ্দেশে উৎসর্গ করতে। স্বপ্নে প্রাপ্ত আদেশ অনুযায়ী হযরত ইব্রাহীম (আ.) তার প্রিয় নানা ধরনের বস্তু আল্লাহর উদ্দেশে উৎসর্গ করার পরে যখন বুঝতে পারলেন যে, আল্লাহ তার কোনো বস্তুগত সম্পদের কোরবানি চান না বরং তার কলিজার টুকরা, নয়নের মনিতুল্য তার প্রিয় সন্তানের কোরবানি চান। হযরত ইব্রাহীম (আ.) তার বার্ধক্যের অবলম্বন ইসমাঈলকে (আ.) আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে কোরবানি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং সে মোতাবেক সন্তানকে নিয়ে তার মনোস্কামনা পূর্ণ করার উদ্দেশে নির্জন স্থানে যাত্রা করলেন। যখন হযরত ইসমাঈলকে (আ.) তার পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.) কোরবানি দেয়ার উদ্দেশে মাটিতে শুইয়ে দিলে তখন যাতে পিতৃত্বের স্নেহ তার মনে জেগে উঠতে না পারে সেই জন্য হযরত ইসমাঈল (আ.) তার পিতার চোখে এক টুকরা কাপড় বেঁধে নেয়ার পরামর্শ দিলেন। আল্লাহর আদেশ পালনে যেমনি বাবা তেমনি তার সুযোগ্য সন্তান। এভাবে চরম পরীক্ষার মাধ্যমে যখন ইব্রাহীম (আ.) স্বীয় পুত্রকে ধারালো ছুরি দিয়ে কোরবানি দিতে আরম্ভ করলেন তখন আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতারা জান্নাত থেকে একটি দুম্বা এনে ইসমাঈল (আ.) উঠিয়ে সে স্থানে শুইয়ে দিলেন। আল্লাহর অপার মহিমায় ইসমাঈল (আ.) এর বিপরীতে পশুটি কোরবানি হয়ে গেলো। হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর ত্যাগের মহিমা এবং হযরত ইসমাঈল (আ.) এর ঈমানি পরীক্ষার দৃষ্টান্তকে দুনিয়ার শেষ দিন পর্যন্ত মানুষের স্মরণে রাখতে সহস্র শতাব্দী কাল ধরে এ প্রথা চলে এসেছে এবং চলতেই থাকবে। 

ইসলামি শরিয়তে কোরবানি করা ওয়াজিব তবে তা শর্ত সাপেক্ষে। ঢালাওভাবে সব মুসলিম নর-নারীর ওপর ওয়াজিব নয়। যার কাছে মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য অথবা সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ কিংবা সমপরিমাণ অর্থ সম্পদ আছে তার ওপরেই কোরবানি ওয়াজিব হবে। তবে এক্ষেত্রে যাকাতের ন্যায় কোরবানিতে সম্পদের বর্ষপূর্তি শর্ত নয় বরং কোরবানি দাতার হুকুম সদকাতুল ফিতরার হুকুমের অনুরূপ। অর্থ্যাৎ ঈদের দিন কারো কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলেই যেমন তার সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হয় তেমনি ঈদুল আজহার দিনে যদি কারো কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ আসে তবে তার ওপরেও কোরবানি ওয়াজিব হয়। ইসলামি শরীয়তের বিধান অনুযায়ী যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়নি, এমন কোনো ব্যক্তি যদি কোরবানির দিন জবেহ করার ইচ্ছায় পশু কেনেন তবে তার ওপরেও কোরবানি ওয়াজিব হয়ে যায়। এ ছাড়া কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য কোরবানি দাতাকে আরো কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। শর্তগুলো হলো সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হওয়া, প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া ও বাড়িতে অবস্থান করা তথা মুকিম হওয়া।

সব শর্ত পূর্ণ হয়ে কোরবানি ওয়াজিব হওয়া সত্ত্বেও যদি কেউ কোরবানির হুকুম পালন না করে তবে সে মারাত্মক গুনাহগার হিসেবে সাব্যস্ত হবে। এ প্রসঙ্গে মানবতার মুক্তির মহান দিশারী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কোরবানি করলো না, সে যেনো আমার ঈদগাহের কাছেও না আসে’।

কোরবানির জন্য ভেড়া, গরু, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা, মহিষ ও উট-এই ছয় প্রকার জন্তু দ্বারা কোরবানি দিতে হবে। ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা একজনের পক্ষ থেকে এবং গরু মহিষ ও উট সর্বোচ্চ সাত জনের পক্ষ থেকে আল্লাহর নামে কোরবানি দেয়া যাবে। ছাগল দিয়ে কোরবানি দেয়ার ক্ষেত্রে ছাগলটিকে পূর্ণ এক বছরের হতে হবে। ভেড়া ও দুম্বা যদি এমন মোটাতাজা হয় যে সেগুলোকে দেখতে এক বছর বয়সী ভেড়া, দুম্বার মতো মনে হয়, তবে তা দিয়ে কোরবানি করা জায়েজ আছে। গরু ও মহিষ দুই বছর বয়সী এবং উট পাঁচ বছর বয়সী হতে হবে। উল্লেখ্য যে, পশু বিক্রেতা যদি পশুকে পরিণত বয়সের বলে উল্লেখ করে কিন্তু বাস্তবে ক্রেতার কাছে তা পরিলক্ষিত না হয়, তবে বিক্রেতার কথার ওপর নির্ভর করে এ পশু দ্বারা কোরবানি বৈধ হবে।

কোরবানির পশু সুস্থ ও মোটা-তাজা হওয়া বাঞ্ছণীয়। সব পশু সমান নয়, পশুর মধ্যে খুঁত থাকা স্বাভাবিক। তবে যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে নিখুঁত পশু দ্বারা কোরবানি দেয়া যায়। যে ছয় ধরনের পশু দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ, সেই সব পশুর মধ্যে যদি শরীয়ত নির্ধারিত কোনো ত্রুটি পাওয়া যায়, তবে সে পশু দ্বারা কোরবানি দেয়া বৈধ নয়। পশুর মধ্যে যে খুঁতগুলো থাকলে সে পশু দ্বারা কোরবানি দেয়া বৈধ নয় তা হলো: যে পশুর কান কাটা। ইমাম আযম আবু হানীফা (রহ.) এর মতে কানের অর্ধেক বা ততোধিক কাটা হলে সে পশু দ্বারা কোরবানি দেয়া উচিত নয়। খোঁড়া, লেজ কাটা, অত্যন্ত দুর্বল, দাঁতহীন ও পাগল। তবে নিখুঁত পশু ক্রয় করার পর যদি কোরবানির প্রতিবন্ধক কোনো ত্রুটি দেখা দেয় আর ক্রেতা যদি নেসাবে মালের অধিকারী না হন তাহলে কোরবানি করার ইচ্ছা পোষণকারীকে অন্য পশু ক্রয় করিতে হবে।

ইসলাম শুধু একটি ধর্ম ব্যবস্থা নয় বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থাও বটে। কোরবানির পশু কীভাবে জবেহ করতে হবে তাও এখানে স্পষ্ট করা হয়েছে। কোরবানির পশু কোরবানি দাতা কর্তৃক নিজ হস্তে জবেহ করা উত্তম। আমাদের নবী করীম (সা.) কোরবানির পশু নিজ হাতে জবেহ করতেন। তবে অন্য লোক দ্বারাও জবেহ করানো যায়। এক্ষেত্রে জবেহকারীকে জবেহ সম্বন্ধীয় সব নিয়ম কানুন জানা থাকতে হবে। অন্যের দ্বারা জবেহ করানোর সময়েও কোরবানি দাতার উপস্থিত থাকা উত্তম। কোরবানিসহ সব পশু জবেহ করার সময় জবেহকারীর মুখে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহ আকবার’ বলতেই হবে। জবেহ করার সময় পশুকে কিবলামুখী করে শুইয়ে দেয়া উত্তম। কোরবানির মেয়াদকাল তিন দিন অর্থ্যাৎ ১০ জিলহজ সূর্য উদিত হওয়ার পর থেকে ১২ জিলহজ সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত। সুতরাং যখন ইচ্ছা দিনে অথবা রাতে কোরবারনি করা যেতে পারে। তবে রাতে পশু জবেহ না করাই ভালো। কেনোনা রাতে জবেহ করতে গেলে জবেহে ত্রুটি দেখা দিতে পারে। কোরবানির ফজিলত নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।

কোরাবনির গোশত ও চামড়া বিষয়ে আমাদের সমাজে প্রায়ই কিছু বিপত্তির সৃষ্টি হয়। এ কথা মানুষ প্রকাশ্যে উচ্চারণ না করলেও ধারণার ফলে চেহারায় অসন্তোষের ছাপ ফুটে ওঠে। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় সাধারণত দেখা যায় একাধিক ব্যক্তির অংশীদারিত্বে কোরবানি দিয়ে গোশত সমান ভাগে ভাগ করে নিতে হয়। এক্ষেত্রে যদি শরিকরা একমত হয়ে কোরবানির গোশত অনুমান করে ভাগ করে নিতে চান তাও জায়েজ নয়। অবশ্যই দাঁড়িপাল্লার মাধ্যমে ওজন করে গোশত ভাগ করে নিতে হবে। কোরবানিতে প্রাপ্ত গোশত তিনভাগ করা উত্তম। তা থেকে এক ভাগ নিজ পরিবার বর্গের জন্য, একভাগ আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজনদের জন্য এবং একভাগ গরিব-অসহায়, অনাথ-মিসকিনদের জন্য। তবে পরিবারের সদস্য সংখ্যা যদি অধিক হয় এবং কোরবানির মাধ্যমে প্রাপ্ত গোশত তিনভাগে বণ্টন করলে নিজেদের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য হয় তবে ভাগ না করে সবটাই নিজেরা খাওয়ার নিয়ম আছে।

তবে মনে রাখা উচিত, ইসলাম সাম্যের ধর্ম। এ ধর্মে আপনার ওপর আপনার প্রতিবেশী এবং গরিব মিসকিনদের দাবি রয়েছে। এ ব্যাপারে কোরআন ও হাদিসে স্পষ্ট করে ঘোষণা দেয়া আছে। যাদের দ্বারা কোরবানির পশু কাটানো হয় তাদেরকে পারিশ্রমিক হিসেবে কোরবানির গোশত দেয়া বৈধ নয়। এ প্রথা শরিয়তে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে এবং এটা মারাত্মক গুনাহের কাজ। এসব লোকদের টাকা কিংবা অন্য কোনো বস্তু পারিশ্রমিক হিসেবে দিতে হবে। কোরবানির পশুর চামড়া নিজের ব্যবহারে লাগানো যায়। কোরবানির পশুর চামড়া দিয়ে জায়নামাজ, বইয়ের মলাট, দস্তর খানা ইত্যাদি তৈরি করে নিজে ব্যবহার করা যায়। যদি এ চামড়া নিজে ব্যবহার না করেন, তবে গরিব মিসকিনকে চামড়া দিতে হবে। কেনোনা এ চামড়া গরিব মিসকিনদের হক। তবে খেয়াল রাখতে হবে, কোরবানির পশুর চামড়া, গোশত বা পশুর অন্য কোন অংশ পরিশ্রমের বিনিময়ে দেয়া যাবে না। অজ্ঞতাবশত কিংবা জেনেও যদি এসব শর্ত ভঙ্গ করা হয় তবে পূণরায় সমপরিমাণ মূল্য গরিবদের মাঝে বিলি করতে হবে।

কোরবানির সঙ্গে তাকবিরে তাশরিক গভীরভাবে সম্পর্কিত। জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজর হতে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ শেষে জামাতে কিংবা একা, পুরুষ কিংবা মহিলা, মুকিম কিংবা মুসাফির সবার ওপর একবার তাকবিরে তাশরিক (আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ) পাঠ করা ওয়াজিব। এ সময়ের মধ্যে যদি ওজর বশত কোনো নামাজ কাজা হয়ে যায় তবে সে কাজা নামাজ আদায়ের পর তাকবিরে তাশরিক পাঠ করা ওয়াজিব। পুরুষরা উচ্চস্বরে এবং নারীরা নিম্নস্বরে বা নীরবে তাকবিরে তাশরিক পাঠ করবেন। জামাতের সঙ্গে নামাজ শেষে ইমাম সাহেব ভুলক্রমে তাকবিরে তাশরিক পাঠ না করলে, মুসল্লিদের মধ্য থেকে যে কাউকে উচ্চস্বরে তাকবিরে তাশরিক পাঠ করা আবশ্যক। কারণ, তাকবিরে তাশরিক ইমাম-মুক্তাদি নির্বিশেষে সবার জন্য পাঠ করা অত্যাবশ্যক ।

পবিত্র কুরআন মাজিদে মহান রব্বুল আলামিন ঘোষণা করেছেন, আল্লাহর কাছে কোরবানির পশুর গোশত কিংবা রক্তের কোনো মূল্য নেই। বরং এক্ষেত্রে কোরবানি দাতার খোদাভীতিই মূখ্য’ । আমাদের সমাজে কোরবানিকে কেন্দ্র করে যেভাবে গোশত প্রাপ্তি ও পরিমাপের প্রতিযোগিত শুরু হয়েছে এটা অবিলম্বে ত্যাগ করতে হবে। কোরবানির পশুর গোশত টাকার সঙ্গে তুলনা করে কেজির দর হিসাব করা উচিত নয়। প্রতিটি ঈদ মানুষের মাঝে সাম্যতার শিক্ষা নিয়ে আগমন করে। কাজেই কোরবানির ঈদও যেনো মুসলমানদের মধ্যে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি করতে পারে তার নিশ্চয়তা আমাদেরকেই দিতে হবে। ঈদুল আজহার শিক্ষার মাধ্যমেই ধনী-গরিবের ব্যবধান দূর হোক। সর্বোপরি মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, যাতে সবার কোরবানি কেবল স্রষ্টার সন্তুষ্টির নিমিত্তে হয়

লেখক: প্রাবন্ধিক

জনপ্রিয়