ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪ , ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ আর্কাইভস ই পেপার

nogod
nogod
bkash
bkash
uttoron
uttoron
Rocket
Rocket
nogod
nogod
bkash
bkash

কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে শিক্ষকদের ভূমিকা

মতামত

মাছুম বিল্লাহ

প্রকাশিত: ০০:০০, ১৭ এপ্রিল ২০২৪

সর্বশেষ

কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে শিক্ষকদের ভূমিকা

কিশোর গ্যাং নামক বিষফোঁড়া ইতোমধ্যে আমাদের সমাজে পচন ধরিয়েছে। সর্বশেষ সংবাদে দেখা গেলো, পবিত্র ঈদের দুদিন পর চট্টগ্রামের এক অভিভাবক নিজের সন্তানকে কিশোর গ্যাংয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে গিয়ে চরমভাবে আক্রান্ত হন এবং হাসাপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। যারা এ কাজ করেছেন তারা সবাই তার ছেলের বয়সী স্কুল পড়ুয়া, স্কুল পালানো বখাটে। সমাজের সর্বত্র, বিশেষ করে, বড় শহরে নগর সভ্যতার বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে গড়ে উঠছে এই ভয়ংকর ব্যাধি। 

অনেকে কিশোর গ্যাং এর হাতে পঙ্গুত্ব বরণ করছেন, মৃত্যবরণ করছে অথচ সমাজ যেনো নির্বিকার। এবার স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’ কিশোর গ্যাং মোকাবলিার জন্য বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি প্রথাগতভাবে অপরাধী মোকাবিলার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কিশোর অপরাধীদের ক্ষেত্রে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিতে বলেছেন। আর এ কাজে তিনি অভিভাবক, শিক্ষক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে যুক্ত হতে বলেছেন। তাদের জন্য বিশেষ কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা, কিছু প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রেখে জাতীয় সুবিধা ও পদ্ধতির কথা তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। 

এই কিশোরদের যাতে দীর্ঘ মেয়াদে অপরাধী বানিয়ে ফেলা না হয়, সংশোধনের সুযোগ থাকে সেটারও ব্যবস্থা করা। কারাগারে তাদেরকে যাতে অন্য আসামিদের সঙ্গে না রাখা হয় সে বিষয়েও নির্দেশনা দিয়েছেন। রাষ্ট্রের একজন প্রধান নির্বাহীর অনেক পূর্বেই অনেক স্তর থেকে আমরা এ ধরনের পদক্ষেপের কথা আশা করেছিলাম। যাইহোক, শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকেই সে নির্দেশনা দিতে হলো। তিনি শুধু প্রধান নির্বাহী হিসেবে নয়, একজন পেশাদার মনোবিজ্ঞানীর মতোই কিশোরদরে ডিল করার কথা বলেছেন এবং নির্দেশনা দিয়েছেন। 

বর্তমানে তিনটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র (গাজীপুর, টঙ্গি ও যশোর) থাকার কথা জানিয়ে মন্ত্রীপরিষদ সচিব বলেন, সংখ্যাটি প্রধানমন্ত্রী বাড়াতে বলেছেন। কিশোরদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর কথাও বলেছেন। কিশোর অপরাধীদের সংশোধনের বিষয়ে একটি প্রকল্প নেয়ার জন্য সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে ইতোমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছেন। কিশোর অপরাধীদের ব্যবস্থাপনায় অবশ্যই মনোবিজ্ঞানী বা কাউন্সেলিংয়ের বড় ভূমিকা রয়েছে। র‌্যাব ও পুলিশের তথ্যমতে, শুধু ঢাকার মধুবাগসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বখাটে কিশোর-তরুণদের নিয়ে অনেক অপরাধচক্র গড়ে উঠেছে। এলাকায় অধিপত্য বিস্তার, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, প্রেম নিয়ে বিরোধ, মাদকদ্রব্যসহ নানা অপরাধে অনেক কিশোর-তরুণ জড়িয়ে পড়ছে।

তারা আরো বলেন, বেশিরভাগ কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার পেছনে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মদদ রয়েছে। সংঘবদ্ধ অপরাধ ঘটাতে তারা গড় তুলছে দল যা ‘কিশোর গ্যাং’ নামে পরিচিত। এটি সমাজকে অস্থির করার বিরাট অশনি সংকেত। উচ্চ শব্দে গান বাজানো, বেপরোয় গতিতে মোটরসাইকেল চালানো, পথচারী ও কিশোর-তরুণীদের উত্যক্ত করা এবং তুচ্ছ ঘটনায় সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হয়ে বড় ধরনের অপরাধ ঘটানো তাদের কাজ। ঢাকা মহানগর পুলিশের তালিকা অনুযায়ী, রাজধানীতে ৫২টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। ডিএমপির আটটি অপরাধ বিভাগের অধীনে ৩৫ থানা এলাকায় এসব চক্রের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৬৯২।

বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাস, আক্রমণ, ভূমি দখল, মাদক পাচার, হত্যা ইত্যাদি কাজে কিশোরদের ব্যবহার ও উপস্থিতি সমাজকে নতুনভাবে আতঙ্কগ্রস্ত করছে। পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির আন্দোলনকালে প্রায়ই হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় কিশোরদের অংশগ্রনও ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলছে সংশ্লিষ্ট সকলকে। পারিবারিক-সামাজিক ধর্মীয় অনুশাসনের অভাব, অপরাজনীতির কদর্য প্রভাব, আধিপত্য বিস্তারের অপচেষ্টা, অনৈতিক-অবৈধ পন্থায় অর্থ উপার্জন, ক্ষমতালিপ্সু ব্যক্তিদের পদ-পদায়, জঙ্গি-সন্ত্রাসী-মাদকসেবন-দুর্নীতির কারণ কিশোর গ্যাং অপসংস্কৃতি অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। দরিদ্র, শিক্ষা ও কর্মবঞ্চিত, নিপীড়িত-নিগৃহীত ব্যক্তি ও পরিবারের এমনকি নিম্ন-উচ্চবিত্তের সন্তানদের অনেকেই এ অপসংস্কৃতির শিকার হচ্ছে।

স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রাচুর্যের ঊর্ধ্বগতি, প্রত্যাশার তুলনায় প্রাপ্তির ব্যাপক দূরত্বের সাংঘর্ষিক মিথস্ক্রিয়া এ অপসংস্কৃতিকে বেগবান করেছে। কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্যে আছে স্থানীয় পর্যায়ের অপরাধী চক্র ও কতিপয় রাজনৈতিক নেতা। সহজ ও স্বল্প ব্যয়ে কিশোরদের দিয়ে তারা অপরাধ করানোর সুযোগ নিচ্ছে। কিন্তু এর পরিণাম যে ভয়াবহ সেটি বোধ করি কেউই তলিয়ে দেখছেন না। শুধুমাত্র সাম্প্রতিক ও ব্যক্তিগত লাভের আশায় তারা এগুলো করাচ্ছেন। গণমাধ্যমের সূত্র মতে ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ২২৫টি। ওই সদস্যরা আলাদাভাবে ১১০টি গ্যাংয়ের সদস্য। গ্যাংগুলোর সদস্য সংখ্যা হাজার খানেক। উল্লেখিত সময়ে গ্রেফতার হয়েছেন বিভিন্ন গ্যাংয়ের ৫২৯ সদস্য, যাদের বয়স ১৩ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। ঢাকা মহানগর পুলিশের তালিকাভুক্ত কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ৫২ এবং সদস্য সংখ্যা প্রায় ৭০০।

সবচেয়ে বেশি গ্যাং রয়েছে ঢাকার মিরপুরে। এখানে ১৩টি গ্যাংয়ের ১৭২ জন সক্রিয় সদস্য আছেন। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে অন্তত অর্ধশত খুনের ঘটনা ঘটেছে। নগরীর চান্দগাঁও এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের ভয়ানক অপতৎপরতার পাশাপাশি জামাল খান ও চকাবাজার ওয়ার্ডেও এদের সক্রিয়তা স্পষ্ট। সিটি করপোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ডের ৩০০ স্পটে বিশেষ করে উঠতি বয়সের কিশোররা বড়ভাইদের মাধ্যমে গ্যাংয়ে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। যশোর শহরেও ২৫-৩০টি কিশোর গ্যাং বেপরোয়া তান্ডব চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংম বা  ৫ কোটি ৭০ লাখ শিশু-কিশোর। তাদের বিকাশের জন্য যা যা প্রয়োজন, তা যদি আমরা করতে না পারি; তাহলে এরা সামাজিক ও রাষ্ট্রের একটি বড় অসংগতি। 

অনেক ক্ষেত্রে ভিনদেশি সংষ্কৃতি তাদের আয়ত্তে চলে আসায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সমাজের শিক্ষক, অভিভাবক, জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ এ কিশোর গ্যাং কালচার থেকে বিপথগামী কিশোরদের সুপথে ফিরিয়ে আনতে পারে। বিভিন্ন সংশোধনাগার, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ, পরিবার-সমাজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট সবার শিশু-কিশোরদের দৈহিক ও মানসিক পরিবর্তনের উপযোগী আচরণগত উন্নয়নে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। বস্তু ও সত্যনিষ্ঠ মূল্যায়ন, গভীর অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গি এক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। কিশোর অপরাধ নির্ধারণে কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি-পেশাকে বিবেচনায় না এনে সামষ্টিক আর্থ-সামাজিক উন্নত ভবিষ্যত রচনায় শিশু-কিশোরদের সামনে জাতীয় আদর্শের উন্মোচন একান্তই জরুরি। দেশপ্রেমিক, সৎ, যোগ্য, মেধাবী, নীতি-নৈতিকতায় ঋদ্ধ, ত্যাগী ব্যক্তিত্ব, পেশাজীবী ও রাজনীতিকদের সমৃদ্ধ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য শিশু-কিশোরদের সামনে তুলে ধরলে তা কিশোরদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা কমাতে ভূমিকা রাখবে। এর পাশাপাশি পাঠ্যবই ও অন্যান্য বিষয়ে রচিত বইসহ বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে মহান যুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় আদর্শের চেতনায় শিশু-কিশোরদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। 

অপরাধ বিজ্ঞানীদের মতে, কিশোর বয়সে হিরোইজমের মনোভাব কাজ করে। এ হিরোইজমকে সঠিক পথের অনুসারী করে তোলা প্রয়োজন। কিশোরদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার ফলেও তাদের মধ্যে এক ধরনের গ্যাং কালচার গড়ে উঠেছে। এর দায় সমাজের সকলের। তবে শিক্ষকেরা যেহেতু জাতি গড়ার কারিগর, তারা যেহেতু সমাজের অভিভাবক, তাদের দায়িত্বটা একটু বেশি। যদিও বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাদের এ ধরনের দায়িত্ব পালন করা কঠিন ও চ্যলেঞ্জিং, তারপরেও শিক্ষকদের যে সুযোগ ও অধিকার রয়েছে সেই জায়গা থেকে তাদের একটি বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। তা না হলে পুরো সমাজকে এই গ্যাং গিলে খাবে।

আমাদের সকল অগ্রগতি ও উন্নয়নকে পেছনে ঠেলে দিয়ে এক অন্ধকার সমাজ গঠনের দিকে এগিয়ে নেবে যা আমরা কেউই চাই না। শিক্ষকেরা যখন এগিয়ে আসবেন তখন সমাজের অন্যান্যরা তাদের সহযোগিতা করবেন। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও প্রশাসন সবাই শিক্ষকদের সহযোগিতা করবেন বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। কিশোর গ্যাং নামক ক্যানসার সমাজে ছড়িয়ে দেয়ার কাজে সামান্য স্বার্থের কারোরই সহযোগিতা করা উচিত নয়। আর রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী যেখানে নির্দেশনা দিয়েছেন সেখান সংশ্লিষ্ট সবাই রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা পাবেন। শিক্ষকেরা শ্রেণিকক্ষে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং সমাজের যেসব পকেটে তাদের বিচরণ, অধিকার ও প্রভাব রয়েছে সেসব স্থানে তাদের প্রকৃত নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। 

জনপ্রিয়