ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪ , ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ আর্কাইভস ই পেপার

nogod
nogod
bkash
bkash
uttoron
uttoron
Rocket
Rocket
nogod
nogod
bkash
bkash

প্রয়োজন স্বশিক্ষিত জনগোষ্ঠী   

মতামত

মো. নজরুল ইসলাম

প্রকাশিত: ০০:০০, ৪ এপ্রিল ২০২৪

সর্বশেষ

প্রয়োজন স্বশিক্ষিত জনগোষ্ঠী   

Study beyond syllabus, my dear, if you want to turn yourself into a perfect human being-ইংরেজির শিক্ষক তার প্রিয় ছাত্রটির হাতে ‘গীতাঞ্জলি’ ধরিয়ে দিয়ে এই বাক্যটিই বলেছিলেন। তিনি আরো বলেছিলেন শিক্ষার নির্দিষ্ট কোনো সিলেবাস হয় না। শিক্ষিত শব্দটির মধ্যেই প্রচ্ছন্নভাবে লুকিয়ে আছে স্বশিক্ষিত শব্দটি আর সে জন্যই প্রমথ চৌধুরি বলেছিলেন, সুশিক্ষিত মানেই স্বশিক্ষিত।

সিলেবাসের সীমিত গণ্ডি অতিক্রম করতে পারলে তবেই প্রকৃত শিক্ষার জগতে প্রবেশ করা যায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা একটি নির্দিষ্ট সিলেবাস অনুসরণ করে পরিচালিত হয়, আর এই শিক্ষার মাধ্যমে একটি সনদ লাভ করা যায় যা দিয়ে চাকরি লাভের যোগ্যতা অর্জিত হয়, ছোটখাটো একটি ব্যবসা পরিচালনা করা যায় এবং সর্বোপরি নিজেকে উচ্চশিক্ষিত বলে ঘোষণা দিয়ে বিয়ের বাজারে অপেক্ষাকৃত ভালো পাত্র-পাত্রী সন্ধান করার সুযোগ ঘটে। তবে তথাকথিত এই শিক্ষা বা উচ্চশিক্ষা নির্দিষ্ট একটি বিষয়ের ওপরে অথবা কয়েকটি বিষয়ের ওপরে একটি সাধারণ ধারণা দেয় মাত্র।

জীবনের বিভিন্ন দিকের ওপর পরিপূর্ণ ধারণা লাভের জন্য জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থীকে সামান্য একটি সনদের তোয়াক্কা না করে বিশাল জ্ঞানসমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডুব দিয়ে মুক্তোর সন্ধান করতে হয় বছরের পর বছর। যিনি এই মুক্তোর সন্ধান লাভ করেন তিনিই স্বশিক্ষিত বলে সম্মান লাভ করেন। পৃথিবীতে যতো মহামানব জন্মলাভ করেছেন, যতো বিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ আছেন, তাদের অনেকেরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, নিজে অনুরাগী হয়ে তারা শিক্ষা লাভ করেছেন, তারা সবাই স্বশিক্ষিত। এমএ পরীক্ষায় বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে একজন ছাত্র  তার এই কৃতিত্বের খবর জানাতে গিয়েছিলেন জাতীয় অধ্যাপক (প্রয়াত) আব্দুর রাজ্জাকের কাছে।

তার মুখে বিভাগে প্রথম স্থান অধিকারের খবর শুনে প্রফেসর রাজ্জাক মৃদু হেসে বললেন, ও আচ্ছা, তাহলে এসো আজ থেকে শুরু করা যাক। ছাত্রটি বুঝতে না পেরে স্যারকে জিজ্ঞেস করলেন, স্যার, আপনি আজ থেকে কী শুরু করার কথা বলছেন? প্রফেসর রাজ্জাক আবারও মৃদু হেসে বললেন, কী আবার, পড়াশুনা। আজ থেকে প্রকৃত পড়াশুনা শুরু করতে হবে তো, না হলে শিক্ষিত হবে কী করে? অর্থাৎ শুধু এমএ পাসের একজন মানুষকে অধ্যাপক রাজ্জাক শিক্ষিত হিসেবে গণ্য করছেন না।

জ্ঞানতাপস এই শিক্ষাগুরু যে খাটে ঘুমাতেন তার চারপাশে একরাশ বই ছড়ানো-ছিটানো থাকতো, তিনি মাঝখানে ঘুমাতেন। লুঙ্গি পরা, ঢাকাইয়া আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা, পায়ে হেঁটে বাজারে গিয়ে নিজ হাতে বাজার করা এবং অতি সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত এই মানুষটি যে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন তা কীভাবে সম্ভব হয়েছিলো? তার ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারের গ্রন্থ-সম্ভারই এ প্রশ্নের জবাব দেয়। ব্যাপক পড়াশুনা তাকে এনে দিয়েছিলো বিরল সম্মান, তিনি জাতির কাছে পরিচিত ছিলেন জ্ঞান-তাপস হিসেবে। 

বাংলা সাহিত্যের দু’জন কর্ণধার রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল। এদের কেউই সনদধারী শিক্ষিত ছিলেন না, অথচ এদের লেখার ওপর গবেষণা করে আমরা পিএইচডি অর্জন করি। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং প্রভাবশালী লেখকদের মধ্যে একজন ছিলেন রাশিয়ার লেখক লিউ (লেভ) টলস্টয়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন বটে কিন্তু লেখাপড়ার মাঝপথে বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করে চলে এসেছিলেন। আমাদের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল যেমন ছিলেন প্রথম মহাযুদ্ধের একজন সৈনিক তেমনই টলস্টয়ও ছিলেন ক্রিমিয়া যুদ্ধের একজন সেনা অফিসার। যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাকে ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ এর মতো জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ প্রণয়নে প্রেরণা যুগিয়েছিলেন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, দেশ ভ্রমণ এবং স্ব-উদ্যোগী হয়ে বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাপক অধ্যায়ন তাকে একজন সফল স্বশিক্ষিত ব্যক্তিতে পরিণত করে। তার ‘দ্য কিংডম অব গড ইজ উইদিন ইউ’ বইটি মহাত্মা গান্ধী এবং মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র এর মতো বিংশ শতাব্দীর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিলো।  

ইসলামের নবী হযরত মুহম্মদ (স.) নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বে নওফেল এবং বহিরা নামক দুই পণ্ডিতের কাছে আব্রাহামিক রিলিজিয়নের ওপর ব্যাপক শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন যদিও কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিনি লেখাপড়া করেননি। সবচেয়ে সফল মোগল সম্রাট আকবর ছিলেন নিরক্ষর যিনি অত্যন্ত দাপট, দক্ষতা ও জনপ্রিয়তার সঙ্গে প্রায় ৫০ বছর রাজত্ব করেছিলেন। তিনি প্রচুর অর্থ ব্যয় করে প্রাসাদে রেখেছিলেন সে সময়ের সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তিদের যারা নবরত্ন নামে পরিচিত ছিলেন। সম্রাট আকবর প্রাসাদের নবরত্নের কাছে নানান বিষয়ে নিয়মিত পাঠ নিতেন  একজন মনোযোগী ছাত্রের মতো এবং তার বহু চেষ্টায় অর্জিত স্বশিক্ষা তাকে এনে দিয়েছিলো সীমাহীন কর্মদক্ষতা ও বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের কাছে বিপুল জনপ্রিয়তা। পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুকে তার জীবনের দীর্ঘ সময় কাটাতে হয়েছিলো ব্রিটিশ-ভারতের বিভিন্ন কারাগারে।

তিনি কারাগারে কখনো অলস-বিশ্রামে সময় কাটাতেন না, কারা কর্তৃপক্ষের কাছে বই চেয়ে নিতেন এবং রাত জেগে পড়াশুনা করে কারাগারে বসেই রচনা করেছিলেন তার বিখ্যাত বই Glimpses of World History. আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেও পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর মতো বহুবার কারাগারে যেতে হয়েছিলো যেখানে তিনিও পড়াশুনা করতেন যা আমরা জানতে পারি তারই রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকে। এ এক অসামান্য রচনা, এক জীবন্ত ইতিহাস, এক উপভোগ্য সাহিত্য। 

এ যুগে প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার সনদধারী বহু শিক্ষিতজনের সাক্ষাৎ মিলবে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। কেউ কেউ সনদের বদৌলতে অথবা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনেক বড় বড় পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন কিন্তু  তাদের অনেকেরই সার্বিক কাজকর্ম, আচার-আচরণ, জনসাধারণের সঙ্গে রূঢ় ব্যবহার, অনৈতিক কর্মকাণ্ড সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে তাদের ভেতরে স্বশিক্ষার প্রকট অনুপস্থিতি। অনেকেই তাদের অধীত সিলেবাসের বাইরে আর অন্যকিছুই শেখার বা জানার কোনো আগ্রহ দেখান না, অথচ একজন মানুষের সুস্থ-স্বাভাবিক সামাজিক জীবন যাপনের জন্য সিলেবাসের বাইরেও অনেক কিছু জেনে নিতে হয় স্ব-উদ্যোগে।

প্রাচীন মানব বন্যজীবন, পাথরযুগ লৌহযুগ, তাম্রযুগ ইত্যাদি পেরিয়ে আধুনিক যুগে এসে পৌঁছেছে অজানাকে জানার, অচেনাকে চেনার অদম্য কৌতূহল, পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং নানা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মাধ্যমে যা কোনো নির্দিষ্ট সিলেবাসের মাধ্যমে ঘটেনি। 

প্রাচীন চীনের প্রখ্যাত দার্শনিক ও চিন্তাবিদ কনফুসিয়াস (খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫১-৪৭৯) বলতেন শিক্ষার মূলভিত্তি হচ্ছে নীতিজ্ঞান এবং নীতিজ্ঞানের উৎস হচ্ছে ব্যাপক অধ্যয়ন। তিনি বলেছেন, Virtuous action towards others begins with virtuous and sincere thought which begins with knowledge. A virtuous disposition without knowledge is succeptible to corruption, and virtuous action without sincerity is not true righteousness. Cultivating knowledge and sincerity is also important for one’s own sake; the superior person loves learning for the sake of learning and riteousness for the sake of righteousness.   

ইংরেজি wisdom বা প্রজ্ঞার উৎসই হলো বিস্তৃত এবং নিবিড় চিন্তামূলক অধ্যয়ন (extensive and thoughtful study)। শিক্ষালাভের অর্থ যদি চাকরি পাওয়া বুঝায় তবে একটি সনদ লাভই যথেষ্ট, তা যেনতেন প্রকারেই হোক না কেনো। এমন সনদ সর্বস্ব শিক্ষা একজন মানুষকে জ্ঞানী না বানিয়ে জ্ঞানপাপী বানাতেই বেশি সহায়তা করে। সমাজে এবং রাষ্ট্রে যতো অন্যায়, অবিচার, বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম এবং দুর্নীতি সংঘটিত হয় তার হোতা এই জ্ঞান-পাপীরা। স্বশিক্ষিত একজন মানুষ সজ্ঞানে কোনো অন্যায় করতে পারে না।

তার যথোপযুক্ত শিক্ষা তাকে সমস্ত অনিয়ম ও দুর্নীতি থেকে বিরত রাখে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের যে বার্ষিক রিপোর্ট বের হয় প্রতিবছর তাতে এ দেশের দুর্নীতির খতিয়ান দেখে যেকোনো সাধারণ নাগরিকের চোখ ছানাবড়া হয়, তারা ভাবে এসব দুর্নীতি সবই তো শিক্ষিত মানুষের কর্ম, কীভাবে সম্ভব হয় তাদের পক্ষে! চারদিকে শুদ্ধাচারের এতো বাণী শোনা যায়, এ শুদ্ধাচার কীসের? যারা প্রতিনিয়ত শুদ্ধাচারের মহান বাণী শোনাচ্ছেন তাদের আচরণ কি শুদ্ধ?  মূল সমস্যা সেখানেই–কুকর্মের সহযোগী সবাই শিক্ষিত কিন্তু স্বশিক্ষিত নন, প্রকৃত অর্থে জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান নন। তাদের কারণেই বহু ত্যাগ ও প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল থেকে সমগ্র জাতি এখনো বঞ্চিত। 

লেখক: যুগ্ম-পরিচালক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় 

জনপ্রিয়