ঢাকা সোমবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ , ২৩ মাঘ ১৪২৯ আর্কাইভস ই পেপার

উচ্চশিক্ষায় মাথাপিছু ব্যয়ে বৈষম্য

শিক্ষা

প্রকাশিত: ১৫:৪৩, ২৪ জানুয়ারি ২০২৩

আপডেট: ১৬:০০, ২৪ জানুয়ারি ২০২৩

সর্বশেষ

উচ্চশিক্ষায় মাথাপিছু ব্যয়ে বৈষম্য

দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীপ্রতি সরকারি ব্যয়ে বৈষম্য বেড়েছে। সাধারণের তুলনায় বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয়ের তারতম্য অনেক বেশি। আবার বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও একটির চেয়ে আরেকটির ব্যয়ে রয়েছে বিস্তর ফারাক।

দেশের ৫০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সরকার বছরে শিক্ষার্থীপ্রতি সবচেয়ে বেশি ব্যয় করছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়ে। অন্যদিকে সবচেয়ে কম ব্যয় করছে জাতীয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পেছনে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দেয়া ২০২১ খ্রিষ্টাব্দের তথ্য নিয়ে এ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

বর্তমানে দেশে ১৫৮টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৫০টি সরকারি ও ১০৮টি বেসরকারি। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ২টি। প্রতিবছর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বাজেট বরাদ্দ করে ইউজিসি। এ ক্ষেত্রে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বরাদ্দ বেশি দেয়া হয়। সেই হিসেবে ২০২১ খ্রিষ্টাব্দে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় হয়েছে সবচেয়ে বেশি। তবে সব বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়কে সমান বরাদ্দ দেয়া হয়নি। যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয়ে বৈষম্য বাড়ছে। অর্থাৎ ভর্তি পরীক্ষায় সামান্য নম্বরের তারতম্যে শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয় বদলে গেলে কমে যাচ্ছে সরকারি বরাদ্দও। ফলে শিক্ষার মানে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে।

ইউজিসির সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ ২১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মাথাপিছু ব্যয় আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। তবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয় আগের বছরের তুলনায় কমেছে।

ইউজিসির তথ্য অনুসারে, ২০২১ খ্রিষ্টাব্দে সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস ইউনিভার্সিটির একজন শিক্ষার্থীর পেছনে বছরে খরচ করেছে ৭ লাখ ৮৮ হাজারেরও বেশি টাকা। যা দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয় করা হয়েছে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পেছনে, যা বছরে ৫ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। ব্যয়ের দিক থেকে পরের অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বছরে শিক্ষার্থীদের পেছনে ৪ লাখ ৩ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে। বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পেছনে এত বেশি টাকা ব্যয় করা হলেও সব বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে তা করা হচ্ছে না।

ইউজিসির প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা গেছে, দেশে ৫০ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসা ও কৃষি সম্পর্কিত ৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বিশেষায়িত এসব বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয়ের তারতম্য অনেক বেশি। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে শিক্ষার্থীপ্রতি সর্বোচ্চ ব্যয় করা হয়েছে ৭ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। বিপরীতে সর্বনিম্ন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যয় করা হয়েছে মাত্র ৩৭ হাজার টাকা।

অন্যদিকে ১৫টি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করা হয়েছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে বছরে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে ১ লাখ ৮৭ হাজার টাকা খরচ করা হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খরচ করা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পেছনে ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। জাহাঙ্গীরনগরে খরচ করা হয়েছে ১ লাখ ৬২ হাজার টাকা। সবচেয়ে কম ব্যয় করা হয়েছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র ৪৪ হাজার টাকা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়কে অর্থ বরাদ্দ করে না। সরকারি বরাদ্দ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিবছর যে অর্থ বরাদ্দ চায়, সেই প্রক্রিয়াটা যথাযথ হয়েছে কি না সেটা দেখভাল করে। এ ক্ষেত্রে আমাদের পয়েন্ট হচ্ছে উচ্চশিক্ষায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

শিল্প ও একাডেমির যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠন করতে হবে। গুণগত গবেষণা বাড়াতে হবে।’

এ ছাড়াও শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও আয়তনে বড় হলেও সবচেয়ে কম টাকা ব্যয় করা হয়েছে জাতীয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পেছনে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ হাজার ২৫৭টি কলেজের ২৯ লাখ শিক্ষার্থীর প্রতিজনের পেছনে বছরে ব্যয় করা হয়েছে মাত্র ৭৪৩ টাকা। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যয় করা হয়েছে ২ হাজার ৭৯৩ টাকা। ফলে ক্রমান্বয়ে মান কমছে উচ্চশিক্ষার এ দুটি বড় প্রতিষ্ঠানের। এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার মানোন্নয়নে এই দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে ইউজিসি।


তবে ইউজিসি বলছে, বরাদ্দ কম হলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান কমার পেছনে মূল কারণ ভিন্ন। বিশ্ববিদ্যালয়টির পুরো শিক্ষা পদ্ধতিই ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে একই শিক্ষক দিয়ে উচ্চশিক্ষা ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয়। মান কমে যাওয়ার পেছনে এটি বড় কারণ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিধি অনেক বড়। সেই তুলনায় শিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ কম। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের গবেষণা কার্যক্রম বাড়াতে হবে। সে জন্য প্রয়োজন উচ্চশিক্ষা উপযোগী শিক্ষক। বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি এসব বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।


এ বিষয়ে ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘উচ্চশিক্ষায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ধারণা, সেখানে বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। শুধু বরাদ্দগত সমস্যা নয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন করতে হলে পুরো সিস্টেমকেই নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে।’

করোনায় কমেছে শিক্ষার্থী
২০২০ খ্রিষ্টাব্দে করোনা অতিমারির পর দেশের উচ্চশিক্ষায় এক বছরে শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় আড়াই লাখ। করোনার আগে পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে উচ্চশিক্ষায় মোট শিক্ষার্থী ছিল ৪৬ লাখ ৯০ হাজার। সেখানে করোনার পরে ২০২১ খ্রিষ্টাব্দে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে ৪৪ লাখ ৪১ হাজার। অর্থাৎ এক বছরে ২ লাখ ৪৯ হাজার শিক্ষার্থী কমেছে।

কমেছে বিদেশি শিক্ষার্থীও
উচ্চশিক্ষায় কমেছে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে যেখানে ৭৬৭ শিক্ষার্থী ছিল, সেখানে ২০২১ খ্রিষ্টাব্দে ৬৭৭ জন বিদেশি শিক্ষার্থী বাংলাদেশে পড়াশোনা করেছেন। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর হার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় বেশি।

ইউজিসির তথ্য অনুসারে, দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিদেশি শিক্ষার্থী রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭ জন। সবচেয়ে কম নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র ১ জন।

জনপ্রিয়