ঢাকা মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪ , ৩ আষাঢ় ১৪৩১ আর্কাইভস ই পেপার

nogod
nogod
bkash
bkash
uttoron
uttoron
Rocket
Rocket
nogod
nogod
bkash
bkash

শিক্ষক ঐক্য ও শিক্ষা জাতীয়করণের প্রত্যাশা

মতামত

অধ্যাপক মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ

প্রকাশিত: ১৪:৪৯, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৩

সর্বশেষ

শিক্ষক ঐক্য ও শিক্ষা জাতীয়করণের প্রত্যাশা

জাতীয় ঐকমত্য তৈরি হয়েছে; শিক্ষা জাতীয়করণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে। মন্ত্রীদের অনেকেই, রাজনীতিবিদ, আমলা, শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ শিক্ষা জাতীয়করণের বিষয়ে নীতিগত সমর্থন ও সংহতি ব্যক্ত করেছেন। অথচ ‘এতো ভঙ্গ বঙ্গদেশ তবু রঙ্গভরা’ উক্তির অনুপম দৃষ্টান্ত: পাঁচ লাখ এমপিওভুক্ত বা বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীর অনৈক্য। তাদের বঞ্চনার অবসান যেন ‘কূঁজোর চিত হয়ে শোয়ার আকাঙ্ক্ষা’র সমার্থক! 

প্রফেসর মুহম্মদ জাফর ইকবাল তার ‘শিক্ষক এবং শিক্ষকতা’ শিরোনামের লেখায় বলেছেন ‘আমাকে একজন জিজ্ঞেস করেছে, আপনার বেশ কয়েকটি পরিচয় আছে....আপনার কোন পরিচয়টিতে আপনি পরিচিত হতে চান? আমি এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে বলেছি আমি শিক্ষক পরিচয়ে পরিচিত হতে চাই....আমরা ফাইল নিয়ে কাজ করি না, যন্ত্র নিয়ে কাজ করি না, আমরা কাজ করি রক্তমাংসের মানুষ নিয়ে। যাদের চোখে রঙিন চশমা এবং যারা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে’।

যে পর্যায়েরই হোক না কেনো, সব শিক্ষকের ভাবনার বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে প্রফেসর মুহম্মদ জাফর ইকবালের বক্তব্যে। প্রকৃত শিক্ষক আসলে খুব বেশি কিছু পাবার আশায় থাকেন না। বরং প্রফেসর মুহম্মদ জাফর ইকবাল তার ‘শিক্ষক এবং শিক্ষকতা’ শিরোনামের লেখায় বলেছেন ‘আমরা যারা শিক্ষক তারা সত্যিকারের মানুষ নিয়ে কাজ করি।....যে ছাত্রটি প্রায় কিশোর হিসেবে একদিন পড়তে এসেছিল, এখন সে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে, দেখে কী ভালোই না লাগে। শুধু আমরা শিক্ষকরাই সেই আনন্দটুকু পেতে পারি...’। কবি কাদের নওয়াজের ‘শিক্ষকের মর্যাদা’র বিখ্যাত পঙ্কতিমালার সার্থকতাও এখানেই:  

 ‘...স্পর্ধার কাজ হেন অপরাধ কে করেছে কোন কালে!
ভাবিতে ভাবিতে চিন্তার রেখা দেখা দিল তার ভালে।
হঠাৎ কি ভাবি উঠি
কহিলেন, আমি ভয় করি না’ক, যায় যাবে শির টুটি,
শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার
দিল্লীর পতি সে তো কোন ছার,
ভয় করি না’ক, ধারি না’ক ধার, মনে আছে মোর বল...।

তাই পাঁচ লাখ এমপিওভুক্ত বা বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীর অহংকার: ‘শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার’।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘাতকের নির্মম আঘাতে সপরিবারে শাহাদাতের কারণে জাতির সব স্বপ্ন, সব সংকল্প অনিশ্চয়তার অন্ধকার গলিতে থমকে দাঁড়ায়। ধারণা করা হচ্ছিলো, ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বঙ্গবন্ধুর মুখে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের ঘোষণা আসবে।

সুদীর্ঘ মুক্তি সংগ্রামে সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জনের পর স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রাথমিক শিক্ষা ও হাজার হাজার প্রাথমিক শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে অনেক আগেই বেসরকারি শিক্ষকদেরও ‘শিক্ষা জাতীয়করণের’ স্বপ্নপূরণ হতো।

১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের সংবিধানের ১৭ (ক) ধারায় বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাদর্শন অবৈতনিক শিক্ষার কথা উল্লেখ থাকলেও আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ২০ মার্চ বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু স্নাতকধারীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের দুই শ’ বছর ও পাকিস্তানের ২৫ বছরে গড়ে ওঠা শিক্ষাব্যবস্থা শুধু কেরানি তৈরি করেছে, মানুষ তৈরি করেনি। এজন্য বঙ্গবন্ধু শিক্ষাব্যবস্থায় আদর্শ, দক্ষ নাগরিক গড়ে তোলার বিষয়ে অধিকতর গুরুত্ব দেন।

বিদেশি সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, বাংলাদেশে কোনোরকম খনিজদ্রব্য সোনা-দানা, হীরা-মুক্তা, তেলসম্পদ বলতে কিছুই নেই, তা সত্ত্বেও বাংলাদেশটিকে আপনি বার বার সোনার বাংলা বলে চিহ্নিত করছেন কেন? সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার বাংলার মাটি আছে, আমার বাংলার মানুষ আছে। আমি বাংলার মাটি এবং মানুষকেই সোনা বলে মনে করি। দেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ। খনিজ সম্পদের চেয়েও বড় সম্পদ। এই মানবসম্পদই একদিন বাংলাদেশকে উন্নতির শীর্ষে নিয়ে যাবে’।

বঙ্গবন্ধু শিক্ষাকে সবসময় সামাজিক রূপান্তরের হাতিয়ার রূপে দেখতে চেয়েছেন। বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতির উন্নতি সম্ভব নয়। তার ভাষায়- ‘শিক্ষা হচ্ছে বড় অস্ত্র যা যেকোনো দেশকে বদলে দিতে পারে’। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলতেন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুরের মতো প্রাকৃতিক সম্পদবিহীন দেশ শুধু মানবসম্পদ সৃষ্টি করে যদি উন্নত দেশ হতে পারে, তাহলে বাংলাদেশও একদিন উন্নত দেশ হবে।
অর্জন-অতৃপ্তির ঘূর্ণাবর্তে শিক্ষা জাতীয়করণ এখন কল্পনাবিলাস মাত্র। অনেকে মনে করেন, নির্বাচনের বছরে সরকারকে বিব্রত করা বা চাপে ফেলার জন্য শিক্ষা জাতীয়করণের চলমান তৎপরতা। কথাগুলো নিতান্তই খণ্ডিত ভাবনা। শিক্ষা

জাতীয়করণের চাওয়া মূলত কয়েকটি কারণে:
১. পেশাগত চরম বঞ্চনা।
২. একজন সাধারণ শিক্ষকের সামর্থ্য এখন এমন যে, কেউ আর তাদেরকে দৈনন্দিন ধার-কর্জও দিতে চায় না।
৩. খণ্ডিত জাতীয়করণের তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান বাদ যাওয়া।
এমন আরো অনেক কারণে এমপিওভুক্তদের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবুও মানুষ গড়ার নিপুণ-নীবর এসব কুশিলবদের আকাঙ্ক্ষা অবদমিত হয়নি। কারণ, আমরা জানি, যুগে যুগে কোনো দিনই মানুষের অধিকারের আওয়াজ হারিয়ে যায়নি। শিক্ষা জাতীয়করণের আওয়াজও ক্ষীণ হলেও শেষ হয়ে যাবে না। বরং জাতীয় প্রয়োজনে বারবার তা ফিরে ফিরে আসবে।
আশা ও আশ্বাস বাণীর মধ্য দিয়ে শিক্ষা জাতীয়করণের ফিকে হয়ে যাওয়া সম্ভবনা টিকে রইলো। আশার করি, শিক্ষা জাতীয়করণে গঠিত কমিটির সুপারিশ ও নীতিমালার আলোকে আগামীতে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।
জিজ্ঞাসা থাকতে পারে কেনো নিরিহ বেসরকারি শিক্ষকদের আহাজারি আকাশের অসীম শূন্যতায় মিলিয়ে যায়? তবে আত্ম-বিশ্লেষণে বলতেই হয়:
•    সর্বস্তরের এমপিওভুক্তদের নেতৃত্বে ঐক্যের অভাব।
•    সরকার ও শিক্ষক নেতৃবৃন্দের পারষ্পরিক যোগাযোগের অভাব।
•    ঘোষিত কর্মসূচিতে সবার অংশগ্রহণ না থাকা।
•    অতি আশাবাদী প্রবণতা।
•    সঠিক নেতৃত্ব ও আন্তঃসাংগঠনিক সমন্বয়হীনতা।
এ সবকিছুর  পরও আমি আমার পেশাগত তিন দশকের অভিজ্ঞতায় সত্য বলতে কী, পেশাগত দাবি আদায়ে আমাদের নেতৃত্বের অনৈক্য খুবই স্পষ্ট এবং আশ্চর্যজনক বাস্তবতায় এর কারণও যথার্থ। তা হলো:
•    জাতীয় রাজনীতির ধারায় শিক্ষক সংগঠনগুলো দলীয় পরিচয়ে ও স্বার্থে ব্যবহৃত।
•    শিক্ষক নেতারা ‘শিক্ষক পরিচিতি’র আড়ালে নির্বাচনের বছরে নিজেদেরকে নতুনভাবে মেলে ধরতে তৎপর।
•    শিক্ষক সংগঠনগুলোর পরষ্পর বিরোধী দারুণ অভিনব কর্মসূচি।
আকাশের লক্ষ তারার মতোই আমাদের শিক্ষক নেতাদের অসংখ্য ধারা! কাজেই, কেউ আমাদের ধার ধারেন না! আমাদের শিক্ষক সংগঠনের নেতারা হয়তো এ বিষয়ে একমত যে, ‘তারা কখনো ঐক্যবদ্ধ হবেন না’! কেউ আবার নেতৃত্ব জাহির করে হঠাৎ নীরব হয়ে যান। তখন তাদের হাতের শোভা ‘এক আশ্চর্য প্রদীপ’। কথাগুলো রূঢ় মনে হলেও, আমার ৩১ বছর অধ্যাপনার পেশাগত অবস্থান বারবার বহুভাবে আমাকে এমনই তিক্ত বাস্তবতার নীরব সাক্ষী করেছে।
কিন্তু নানান বঞ্চনায় নিমজ্জিত এমপিওভুক্ত সাধারণ শিক্ষকদের আর কতোকাল আক্ষেপ ও অপেক্ষা করতে হবে? কে শোনাবে মানুষ গড়ার কারিগরদেরকে আশার বাণী? 
বছরে অসংখ্যবার তেল, গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব কিছুর দাম বৃদ্ধিতে নিম্ন আয়/স্বল্প বেতনের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জীবনযাত্রায় সমন্বয় করা খুবই কঠিন হয়ে গেছে। এমনকি ক্ষেত্রভেদে সন্তানের লেখাপড়া, ব্যক্তিগত চিকিৎসাসহ অনেক প্রয়োজনই রয়ে যায় অপূর্ণ। থমকে দাঁড়ায় জীবনের স্বাভাবিক গতি। সংসারের অভাব-অনটন ও অশান্তিতে জর্জরিত অনেকের গোপন কষ্টের হাহাকার তখন আর আড়াল থাকে না! 
আমি তবুও প্রত্যাশার পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। একটি হিসেবে দেখা যায়-যদি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বেতনের পুরো অংশ সরকারি কোষাগারে জমা নিয়ে শিক্ষার পুরো দায়িত্ব সরকার নিতো তাহলে সরকারের লাভ বেশি হতো। এমনিতেই বেসরকারি শিক্ষকরা বর্তমানে বেতন স্কেলের শতভাগ, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পেয়ে থাকেন। এ ছাড়াও আছে বাড়িভাড়া আর সামান্য মেডিক্যাল ভাতাসহ অন্যান্য ভাতা।
আমরা বেসরকারি শিক্ষকরা বার্ষিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করার পর জাতীয়করণের অনেক কাছাকাছি চলে এসেছি। শিক্ষার্থীদের থেকে আদায়কৃত অর্থসহ প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় আয় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নিয়ে শিক্ষার পুরো দায়িত্ব সরকার নিলে এটাই হবে জাতীয়করণের সহজ সূত্র। জাতীয়করণ হলে শিক্ষকরাই লাভবান হবেন না, লাভবান হবেন শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরাও। তারা তাদের দোরগোড়ায় পছন্দের সরকারি স্কুল-কলেজ পাবেন, সাঙ্গে তাদের আর্থিক সাশ্রয়ও হবে।
পাঁচ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী ও তাদের পরিবার তাকিয়ে আছেন, মাদার অব হিউমিনিটি খেতাবধন্য প্রধানমন্ত্রীর দিকে। শিক্ষক দরদি প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট ঘোষণা বাংলাদেশের প্রায় ১০০ শতাংশ বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীর মুখে হাসি ও বুকে সাহস জোগাবে। এজন্যই ব্যক্তিগত আস্থার অবস্থান থেকে আমি মনে করি, পেশাগত প্রাণের দাবি আদায়ে নেতিবাচক কর্মসূচি বা কোনো রূঢ় বাস্তবতার দিকে আমাদের নেতারা যাবেন না বরং সবার ঐক্যবদ্ধ আওয়াজ: ‘পাঁচ লাখ এমপিওভুক্তের ঐক্য যদি রয়, শিক্ষা জাতীয়করণ হবে নিশ্চয়’।

লেখক: বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, গাজীপুর
 

জনপ্রিয়