ঢাকা সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪ , ১ বৈশাখ ১৪৩১ আর্কাইভস ই পেপার

nogod
nogod
bkash
bkash
uttoron
uttoron
Rocket
Rocket
nogod
nogod
bkash
bkash

মাধ্যমিকে বয়ঃসন্ধিকাল ও পিয়ার মেন্টরিং

মতামত

গুরুদাস ঢালী

প্রকাশিত: ০০:০০, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

সর্বশেষ

মাধ্যমিকে বয়ঃসন্ধিকাল ও পিয়ার মেন্টরিং

শিক্ষা যদি জীবনব্যাপী চলমান হয় তাহলে আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি, শেখার কোনো শেষ নেই, জানা বা বোঝার কোনো অন্ত নেই। চিরায়ত অগ্রসরমান জীবনের পরতে পরতে আমরা শিখি। কেউ কেউ শেখাটাকে আত্মস্থ করে সাফল্যের চূড়ায় উঠতে সক্ষম হন। অন্য কেউ শিখে নিজেকে আস্তাকুড়ে শপে দেয়। পথ আলাদা হলেও এক জায়গায় মিল আছে, আমরা মানুষ।

মানুষের জীবন বিকাশের বিভিন্ন বয়সভিত্তিক পর্যায় বা সময়কাল আছে। বিজ্ঞানীরা এ পর্যায়গুলোকে ভিন্ন ভিন্ন নামে ভাগ করেছেন বা অভিহিত করেছেন। এই ভাগগুলো হলো-শৈশব, কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ় ইত্যাদি। অনেকে আবার জীবন কালের আরো কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন। তবে বলতে বাধা নেই, মূলত কৈশোরকালের একটি বড়ো অংশকে বয়ঃসন্ধিকাল বলা হয়। বলতে বাঁধা নেই প্রাথমিক শিক্ষা, শিক্ষার ভিত রচনা করে, মাধ্যমিক শিক্ষা জীবনের ভিত রচনা করে। ইউনিসেফের সবশেষ তথ্যমতে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৩ কোটি ৬০ লাখ ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরী। যারা এদেশের মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ।

জীবনের যে পর্যায়ে একটি শিশু একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ হয়ে ওঠে এবং তার মধ্যে প্রজনন ক্ষমতা তৈরি হয় তাকে বয়ঃসন্ধিকাল বলে। বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েদের কিশোরী এবং ছেলেদের কিশোর বলা হয়। মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকাল ছেলেদের তুলনায় আগে শুরু হয়। মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকাল ১০-১১ বছর থেকে ১৮-১৯ বছর পর্যন্ত এবং ছেলেদের বয়ঃসন্ধিকাল ১২-১৩ বছর হতে ১৮-১৯ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ১০ বছর এবং ১৯ বছর বয়সের মাঝামাঝি সময়টাকে কৈশোর বলে। এর যেকোনো সময়ে বয়ঃসন্ধিকাল আসতে পারে। এটা মূলত কৈশোর ও যৌবনের মধ্যবর্তী সময়।
অনেক সময় ১৯ বছরের পরও বয়ঃসন্ধির ব্যাপ্তি থাকতে পারে। যা বিভিন্ন দেশ, সংস্কৃতি, পরিবেশ, স্বাস্থ্য, খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপনের ওপর নির্ভর করে। চিকিৎসকদের মতে, মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকাল, ছেলেদের চাইতে কিছুটা আগে শুরু হয়। মূলত ১০ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে যেকোনো সময় তা হতে পারে। অন্যদিকে ছেলেদের ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধিকাল আসে ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সের মধ্যে।

বয়ঃসন্ধিকালীন থেকে ছেলে-মেয়েদের আত্মপরিচয় গড়ে উঠতে শুরু করে বলে জানিয়েছে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ। আত্মপরিচয় বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে, তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা তৈরি হয়। তার কী পছন্দ-অপছন্দ, সে কী চায়। এ ছাড়া নিজের জীবন, সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম সম্পর্কে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে। এবং তারা পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন মানুষ হিসেবে জীবনের এই পর্যায়ে আত্মপ্রকাশ করে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে শৈশবে তারা যেমন মা বাবা যা বলতো তাই করতো, তাই ভাবতো। কিন্তু এই বয়ঃসন্ধির সময় তারা স্বাধীনভাবে সবকিছু ভাবতে শুরু করে। সে কী পরবে, কী খাবে, কাদের সঙ্গে মিশবে সেটা সে নিজে সিদ্ধান্ত নেয়। যা তার পরিবারের থেকে আলাদা হতে পারে। এজন্য বাবা মায়ের সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। ভালমন্দের একটা ধারণা তৈরি হয়, যদিও সেটাকে খুব পরিপক্ব বলা যাবে না।

ছোট থেকে বড় হওয়ার এই সময়টাতে বড় ধরনের মানসিক ভাঙা-গড়ার মধ্যে দিতে হয় এই  বয়সের কিশোর-কিশোরীদের। এ সময় তাদের মধ্যে হরমোনাল কারণে আবেগের প্রাবল্য দেখা দেয়। মন মেজাজ খুব দ্রুত ওঠানামা করে। আনন্দ, রাগ, দুঃখের মতো অনুভূতি তীব্র মাত্রায় দেখা যায়।

আজ আনন্দে উল্লাস করলে আরেকদিন মন মরা ভাব থাকে। এ বয়সের প্রাণচাঞ্চল্য ভেতরের সৃজনশীলতার বিকাশে অনেক বড় ভূমিকা রাখে। বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেমেয়েরা যৌন ক্ষমতা অর্জন করে। দেহের আকস্মিক পরিবর্তন তার মনোজগতের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তাই, কিশোর-কিশোরীদের মনে এক ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বিপরীত লীঙ্গের প্রতি আকর্ষণ বেশি পরিলক্ষিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় কিশোর অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। ভালো-মন্দ হিসেব না করে বিয়েও করতে দ্বিধা করে না। আর যখন সম্বিত ফেরে তখন আর সময় ফুরিযে যাবার পথে।

বয়ঃসন্ধিকালে পরিচিত বা অপরিচিত মানুষ হঠাৎ করেই কিশোর-কিশোরীদের বড়ো ভাবতে শুরু করে। আবার, একই সঙ্গে বড়দের মতো আচরণ করলে সেটাও ভালো চোখে দেখে না; পাকামি বলে মনে করে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাই এ সময়কে ‘বিপত্তি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। বয়ঃসন্ধিকালে হঠাৎ করেই নিজের মধ্যে নতুন নতুন পরিবর্তনের কারণে তাদের আচরণেও পরিবর্তন সাধিত হয়। যেমন-এ সময় কিশোর-কিশোরীরা বড়োদের মতো আচরণ করতে চায়। নিজেকে স্বতন্ত্র পরিচয়ে প্রকাশ করতে চায়। নিজস্ব মতামত প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। আবেগময় আচরণ করে। বীরত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে আগ্রহ বাড়ে ইত্যাদি।

বয়ঃসন্ধিকালে খানিকটা আকস্মিকভাবেই কিশোর-কিশোরীদের জীবনে পরিবর্তন আসে। একই সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের সঙ্গে অভ্যস্ত হতে হয়। উপরন্তু, পারিবারিক ও সামাজিকভাবেও তারা ভিন্ন রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। কারণ, শৈশবের শেষে এবং যৌবনের প্রারম্ভের এই সময়টাতে পরিবার ও সমাজ তাদের কাছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো সুস্পষ্ট আচরণ প্রত্যাশা করে না। কখনো কখনো তাদের থেকে বালক-বালিকার মতো আচরণ প্রত্যাশা করে আবার কখনো প্রাপ্তবয়স্ক কোনো ব্যক্তির মতো পরিপক্বতা আশা করে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে তারা প্রায়শই মানসিক চাপের মধ্যে পড়ে। শারীরিক, মানসিক, আচরণিক, সামাজিক, পারিবারিক এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাদের পরিচয় না থাকায় তারা অনেক সময় আতঙ্কিত ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

অনেকে বিরক্তি প্রকাশ করে ও খিটখিটে মেজাজের হয়ে যায়। মাধ্যমিক স্তরের ছেলেমেয়েদের বয়সটা বেশি বিবেচনা করতে হবে। যদি বলি বয়ঃসন্ধিকাল মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার অন্যতম কারণ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো এই প্রসঙ্গটা উপেক্ষিত, বিভিন্ন আলোচনায় তা স্পষ্ট হয়েছে।

মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষার মূলধারা থেকে ছিটকে পড়া বা ঝড়ে পড়ার কারণ আলোচনায় অনেকে বলেছেন, দারিদ্র্যতা ও বাল্যবিয়ে। ফলে তৈরি হয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের মতো ভয়ানক ও ভয়ংকর সামাজিক অবক্ষয় যা সমাজে প্রতিনিয়ত সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। সৃষ্টি হয়েছে শিশুশ্রমের মতো দাসত্ব, আত্মহত্যা, বৃদ্ধি পেয়েছে অকাল মাতৃমৃত্যুর হার, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের। আমরা আমাদের শিশুর সুস্থ, উন্নত চিন্তা চেতনার ও জীবনবোধের অধিকারী দেখতে চাই।  

আমরা যখন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কাজ করতাম তখন পিয়ার মেন্টরিং বলে একটা বিষয় ছিলো। পিয়ার মেন্টরিং হলো সহযোগী সমবয়সী বন্ধু। শ্রেণিকক্ষে পেয়ার মেন্টরিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হলো এমন একটি পদ্ধতি যেখানে একজন শিক্ষার্থী অন্য শিক্ষার্থীকে তাদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, এবং দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে। এই পদ্ধতিটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহযোগিতা, সহযোগিতার মাধ্যমে শেখার প্রক্রিয়া বাড়ানোর জন্য প্রযোজনীয় প্রেরণা, সহানুভূতি ও সমর্থন সরবরাহ করে। পিয়ার মেন্টরিং কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে।

প্রথমে পিয়ার মেন্টর নির্বাচন করা হয়। এটি অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও সমর্থনের দিক থেকে যাচাই করার মাধ্যমে। একজন মেন্টরের দলে ৬ থেকে ৭ জন সহপাঠী সদস্য থাকবেন যারা সময়ে মেন্টরকে সহযোগিতা করবেন। পিয়ার মেন্টরিং কার্যক্রমের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা,সবাই কে বিষয়টি সর্ম্পকে স্পষ্ট ধারণা দেয়া। পিয়ার মেন্টরদের মধ্যে শ্রেণিকক্ষের বিভিন্ন কাজ ভাগ করে দেয়া হতো সময়সূচি নির্ধারণ করা থাকতো যাতে সকল ক্ষেত্রে সময়ের সুষ্ঠু সমন্বয় হয়।

সবার প্রতি পিয়ার মেন্টরের সহায়তা, তেমনি মেন্টরের প্রতি সবাই সহায়তা এবং সমর্থন দেবেন যাতে সকলে তাদের লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা পেয়ে থাকেন। মেন্টর এবং সহপাঠীদের মধ্যে একটি মৌলিক এবং সুস্থ সম্পর্ক গঠন করা হয়। এটি পিয়ারের মধ্যে বিশ্বাস, সমর্থন এবং সম্মান গঠনে সাহায্য করে। মেন্টর পিয়ারের সঙ্গে নির্দেশনার মাধ্যমে তাদের পছন্দের ক্ষেত্রে সঠিক পথ অনুসরণ করতে সাহায্য করা।

প্রশিক্ষণ এবং উন্নতির সুযোগ প্রদান করা, যাতে তারা তাদের ক্ষমতা বাড়াতে পারেন। পিয়ার মেন্টরিং প্রোগ্রামে মূল্যায়ন করা হলে মেন্টর ও সহপাঠী সহযোগীদের উন্নতি ও প্রগতির বিষয়টি নিরীক্ষণ করা হয়।

পেয়ার মেন্টরিং প্রোগ্রামে সফলতা অর্জনের প্রধান দরকারি অংশ, সম্পর্কের ভিত্তিতে প্রতিনিয়ত সমর্থন এবং সহায়তা প্রদান। এই পরিকল্পনার সফলতা অর্জনের জন্য সবার মধ্যে বিশ্বাস, সম্মান, এবং উৎসাহ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার যেসব শ্রেণিতে এই কাজ পরিচলনার পরে স্কুলের হাজিরা বাড়তে থাকলো। স্কুলের বিভিন্ন দিবসের আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন সব কিছু কেমন গোছানো ও সফলতার সঙ্গে শেষ হচ্ছে। দেয়াল পত্রিকা, ডিবেটিং ক্লাব, আন্তশ্রেণি ক্রীড়াসহ অনান্য সহপাঠক্রমিক কাজ ও আনন্দঘন পরিবেশে চলছে। উল্লেখ্য, এ কাজ করতে শ্রেণি কার্য়ক্রম পরিচালনায় কোনো সমস্যা  হয়েছে এমন অভিযোগ কোনো স্কুল বা শিক্ষক দিয়েছেন বলে আমার মনে হয় না।

জনসন অ্যান্ড জনসন এর মতে, শ্রেণিকক্ষে সহযোগিতামূলক শিখন কার্যক্রম চলবে পুরো ক্লাস সময়ের ৭০ ভাগ সময়। ব্যক্তিগত শিখন কার্যক্রম চলবে ২০ ভাগ সময়। প্রতিযোগিতামূলক শিখন চলবে ১০ ভাগ সময়। সহযোগিতামূলক পদ্ধতি ব্যক্তির চেয়ে দলের সকলের সমতালে শিক্ষালাভের বিষয়ে বেশি কার্যকর। এ পদ্ধতির সুবিধা, যৌথভাবে কাজ করে সুনির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। দলের সব সদস্যই তাদের সামর্থ অনুযায়ী অবদান রাখতে পারে।পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে শিখন কার্যক্রম সম্পন্ন হয় এবং নেতৃত্ব তৈরি হয়। দলের সব সদস্য একই বিষয়ে চিন্তা করার সুযোগ পায়। সবার কাজের মূল্যায়ন করা যায়। শিক্ষার্থীরা তাদের চিন্তা-চেতনা এবং ধারণার পারস্পরিক আদান-প্রদান করতে পারেন। এ পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের মাঝে সহজেই প্রেরণার সৃষ্টি করতে পারে। শিক্ষার্থীরা জ্ঞানমূলক এবং সামাজিক বিকাশ সহজতর করতে পারেন। শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মসম্মান বোধ জাগ্রত করে।

মেন্টরিং-এর প্রধান লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীকে আত্মবিশ্বাসী, আত্মনির্ভরশীল ও আত্মনিয়ন্ত্রিত হতে সাহায্য করা এবং বিভিন্ন চাহিদার সঙ্গে যথোপযুক্ত উপযোজন করে উন্নততর ও কার্যকর জীবনযাপন করতে সাহায্য করা। মেন্টরিং এমন একটি প্রক্রিয়া যা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয়, যেমন-চাহিদা, প্রেরণা, আবেগ, প্রত্যক্ষণ, আত্মোপলব্ধি ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে অবগত হতে সাহায্য করে। মেন্টরিং আচরণে পরিবর্তন আনে, আত্মরক্ষার দক্ষতা বৃদ্ধি করে। এখন প্রশ্ন হলো মেন্টরিং এর এই সুবিধা শিক্ষা ক্ষেত্রে কী করে প্রয়োগ করা সম্ভব? 

গত ৩০ বছর ধরে পশ্চিমা বিশ্বে স্কুল-মেন্টরিং একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষামূলক এবং ব্যক্তিগত বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্কুল-মেন্টরিং সেবা শিক্ষার্থীদের বিকাশমূলক ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। শিক্ষার্থীদের অতীত অভিজ্ঞতা এবং তাদের সমস্যার ভিন্নতা ও এর ধরন নিয়ে আলোচনা করে স্কুল-মেন্টরিং। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে স্কুল-মেন্টরিং সেবা তেমনভাবে বিকশিত হয়নি। তবে সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা, যেমন- নির্যাতন, মাদকগ্রহণ, আত্মহত্যা, বিদ্যালয়ের নিয়মশৃঙ্খলা পালনে অবাধ্যতা, প্রত্যাশিত ফলাফলে অক্ষমতা ও মানসিক চাপ মোকাবিলা করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের অনেক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মেন্টরিং সেবা দেয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে কোনো কোনো বিদ্যালয় এই সেবা প্রদানের জন্য বিদ্যালয়ে পেশাগত কাউন্সেলর বা মেন্টর নিয়োগ দিয়েছেন। প্রাথমিক শিক্ষা এবং মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক বিভিন্ন ধরনের বক্তৃতা বা কার্যক্রমের ব্যবস্থা করে শিক্ষার্থীদের শিক্ষামূলক বিষয়ে আগ্রহী করে তুলতে পারেন।

বিভিন্ন বৃত্তিমূলক বিষয়ে আগ্রহ সৃষ্টি করার জন্য বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ, বিভিন্ন পেশাজীবীকে আমন্ত্রণ জানানো বা বিশেষ বিশেষ সহপাঠক্রমিক কাজে অংশগ্রহণ করিয়ে শিক্ষার্থীদের মেন্টর হিসেবে কাজ করতে পারেন। এ জন্য শিক্ষককে ব্যক্তিগত পর্যায়ে উপাত্ত সংগ্রহ করতে হয়। সে জন্য তাদের অভিভাবকদের সাক্ষাৎকার নেয়া, বিদ্যালয়ে ভিজ্যুয়েলিটি ও রেকর্ড কার্ডের ব্যবস্থা করা, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে নিয়মিত মিটিংয়ের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি উদ্যোগ নিতে পারেন তিনি। আজকের শিশু আগামীদিনের ভবিষ্যত। যথোপযুক্ত শিক্ষা এবং পরিবেশ একজন শিক্ষার্থীকে সমাজে বসবাসের উপযুক্ত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে প্রয়োজনীয় এবং সমাজ-অনুমোদিত আচরণ রপ্ত করতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। আত্ম-উন্নয়ন ঘটানোর মাধ্যমে নিজেকে সমাজের উপযুক্ত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা-এই লক্ষমাত্রা নিয়েই তো প্রতিনিয়ত পথ চলি। শিশুকাল থেকেই শিশুর আচরণীয় সমস্যা অনুধাবন করে সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট হলে প্রত্যেকটি শিশুই সুনাগরিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

শিশুকাল থেকে যথাযথ নির্দেশনা ও উপদেশ প্রদান না করার কারণে অনেক সফল ও দায়িত্ববান মানুষদেরও আমরা আচরণীয় সমস্যায় ভুগতে দেখি। এও সত্য মেন্টরিং চলমান প্রক্রিয়া। তাই একটি বিশুদ্ধ শিখন সমাজ গঠনে মেন্টরিং অপরিহার্য।

লেখক: শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বেসরকারি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার টেকনিক্যাল অফিসার

জনপ্রিয়