ঢাকা সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪ , ৪ আষাঢ় ১৪৩১ আর্কাইভস ই পেপার

nogod
nogod
bkash
bkash
uttoron
uttoron
Rocket
Rocket
nogod
nogod
bkash
bkash

পেনশনভোগীদের দুর্দশা লাঘবের প্রত্যাশা

মতামত

মো. সিদ্দিকুর রহমান

প্রকাশিত: ০০:১০, ১৯ মে ২০২৪

সর্বশেষ

পেনশনভোগীদের দুর্দশা লাঘবের প্রত্যাশা

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের ৯ম বেতন স্কেল প্রদানের বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার। বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে স্বস্তি প্রদানের লক্ষ্যে মূল বেতনের সঙ্গে ৫ শতাংশ যোগ করে কর্মচারীদের কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করেছে সরকার। এই ৫ শতাংশ প্রণোদনা মূল বেতনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় প্রতিমাসে বাড়িভাড়া ভাতার সুবিধাসহ মূল বেতন বৃদ্ধিতে আপাতত প্রচণ্ড গরমে এক পশলা বৃষ্টির পর কিছুটা হলেও স্বস্তি অনুভব করছেন পেনশনগমনকারীরা। সরকারি কর্মচারীদের প্রচণ্ড গরমে জীবনযাত্রায় এই স্বস্তি কাম্য ছিলো না। ৫ শতাংশ প্রণোদনার সর্বনিম্ন বৃদ্ধির হার ১ হাজার টাকা। পেনশনভোগীদের জন্য সবচেয়ে বেশি পীড়াদায়ক হলো তাদের সর্বনিম্ন বৃদ্ধির হার ৫০০ টাকা। তবে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীসহ সবাই ৫ শতাংশ ভাতা পেলেও বাদ পড়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরি কাম প্রহরীরা। একই ছাদের নিচে কর্মরত শিক্ষক ও দপ্তরিরা। তারা শুধু ৫ শতাংশ ভাতা থেকে বাদ পড়েননি। গত ঈদুল ফিতরে তাদের উৎসব ভাতা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এ বঞ্চনা শুধু অসহায় দপ্তরিদের নয়, বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা সরকার প্রধান হওয়ার পরে এ না পাওয়ার বেদনা সবার। সংশ্লিষ্টদের হৃদয়ে একটু উপলব্ধিবোধে জাগ্রত হোক এ প্রত্যাশা রইলো। 

সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার প্রবীণ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরা। জীবনের শেষ প্রহরে শারীরিক মানসিক অক্ষমতার পাশাপাশি আর্থিক অসচ্ছলতা, মৃত্যুর পূর্বে এ অস্বস্তি কাম্য হতে পারে না। এ বেদনা বা কষ্ট লাঘবে, সময়ক্ষেপণ করা মোটেই যথার্থ নয়। বয়সের বিবেচনায় মৃত্যুর পথযাত্রীদের স্বস্তি দেয়ার লক্ষ্যে জাতীয় বাজেট ২০২৪ প্রত্যাশা রেখে কতিপয় দুঃখ বেদনা উপস্থাপনা করছি।

চিকিৎসা: প্রবীণ পেনশনভোগীরা শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক দিক থেকে পর্যুদস্ত। যুবক- যুবতীদের মতো তারা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। রোগে শোকেও পরকালের ভাবনায় তারা অসহায় হয়ে রয়েছেন। যুবকদের চেয়ে তাদের চিকিৎসা ব্যয় বহুগুণ বেশি। বর্তমান ওষুধের ও চিকিৎসার খরচ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ প্রেক্ষিতে তাদের শারীরিক মানসিক সুস্থতার অভিপ্রায়ে সদ্য পেনশনপ্রাপ্তদেরসহ ৬৫ বছরের নিচে ৫ হাজার টাকা, ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে ৭ হাজার ৫০০ টাকা ও ৭০ বছরের ঊর্ধ্বে ১০ হাজার টাকার চিকিৎসা ভাতা প্রদানের যৌক্তিক নিবেদন করছি। 

শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীদের দুর্দশা: পেনশন ভোগকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্দশায় আছেন, শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীরা। নানা কারণে তাদের এককালীন পেনশনের সমুদয় অর্থ শতকরা ৯৯ ভাগ কর্মচারীরা নানাভাবে শেষ করে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। যেহেতু শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীরা মাসিক ভাতা পাচ্ছেন না। সেহেতু ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দে সরকারের ৫ শতাংশ প্রণোদনার অর্থ মাসে মাসে তারা পাচ্ছেন না। তাদের ক্ষেত্রে উৎসব ভাতা ছাড়া স্বপ্ন দেখার প্রশ্নই আসে না। বর্তমান অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীবান্ধব সরকার শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীদের ১৫ বছর পর পেনশন পুনঃস্থাপনের এক মহতি উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এতে খুবই নগণ্য সংখ্যক পেনশনভোগী ১৫ বছর পর্যন্ত বেঁচে থেকে পেনশনের সুবিধাসহ ৫ শতাংশ প্রণোদনার অর্থ পর্যন্ত পাওয়ার সুযোগ পেয়ে আসছেন। তাদের শতভাগ পেনশনের ৫০ শতাংশ অর্থ ৮ বছরের মধ্যে যথারীতি মাসিক ভাতা গ্রহণ না করায় পরিশোধ করা হয়েছে।

বর্তমানে সবচেয়ে বেশি অসহায় অবস্থায় আছেন শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীরা। তাদের অসহায়ত্বের কথা বিবেচনা করে বর্তমান সরকার শতভাগ পেনশনসমর্পণ বন্ধ করে দিয়েছে। বিধায় বর্তমানে এদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে না। বরং বয়স বেশি হওয়ায় মৃত্যুজনিত কারণে তাদের সংখ্যা দ্রুত কমছে। তাদের স্বস্তিতে মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত বেঁচে থাকার অভিপ্রায়ে ১৫ বছরের স্থলে ১০ বছর পেনশন পুনঃস্থাপনের বিষয়টি সুবিবেচনার আশা রইলো। 

একই পদে পেনশনের বিশাল বৈষম্য: বঙ্গবন্ধু আজীবন বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। এর ফলশ্রুতিতে আমরা পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। তারই আদর্শ অবিচল থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বৈষম্য দূর করার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। কর্মরত থাকাকালীন সময়ে লক্ষ্য করেছি, জুনিয়ররা সিনিয়রদের চেয়ে কম বেতন পেয়ে থাকেন। অথচ পেনশনের ক্ষেত্রে জুনিয়র পেনশনভোগীরা সিনিয়রদের চেয়ে ভাতা বেশি পেয়ে আসছেন। পেনশনভোগীদের এ বৈষম্য অনেকটা গীতি কবি হাসন রাজার গানের মত ‘সবাই বলে বয়স বাড়ে, আমি বলি কমে’। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে আয়ু কমে কিন্তু সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক দায়ভার কমে না। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ভাতা ছিলো খুবই কম। তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবনধারণ ছিলো অতি কষ্টের। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের পর এ কষ্ট অনেকটা লাঘব হয়েছে। ওই সময় তাদের বেতন স্কেল দ্বিগুণ বৃদ্ধি হওয়ায় বিশাল বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। ওই বৈষম্য স্বাভাবিক নিয়মনীতির পরিপন্থী। এ অমানবিক বৈষম্য দূর করা জরুরি। 

সামাজিক মর্যাদা: সিনিয়র পেনশনভোগীরা রোগে শোকে আর্থিক অসচ্ছল থাকলেও সমাজে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদার অধিকারী। জীবনের দীর্ঘ সময় দেশ ও জাতির সেবা করে আজকে তারা মানসিক শারীরিক ও আর্থিক দৈন্যতায় পর্যদুস্ত। সিনিয়র পেনশনভোগীরা মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা আন্দোলনে বিশাল কর্মযজ্ঞের অংশীদার। তাদের সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে হাসপাতালে যানবাহনসহ সব ক্ষেত্রে আলাদা সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দুঃখ ও ক্ষোভের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, আজও যুবক-যুবতী সবার সঙ্গে প্রবীণদের একই লাইনে হুমড়ি খেয়ে অবস্থান করতে হয়। 
প্রবীণদের বয়সের ভারে অসহায়ত্বের কথা বিবেচনা করে, তাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দেয়া প্রয়োজন। তাদের দেশ ও জাতির প্রতি ত্যাগ অবদানের কথা স্মরণ করে যৌক্তিক সমস্যা দূরীকরণের প্রত্যাশা রইলো। এবার সরকারি কর্মরত কর্মচারীদের প্রসঙ্গে আলোকপাত করছি। 

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যেখানে গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দে ৮ হাজার থেকে উন্নীত করে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছে পক্ষান্তরে সরকারি কর্মচারীদের সর্বনিম্ন গ্রেড ৮ হাজার ২৫০ টাকা যা অত্যন্ত অমানবিকই বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

১১ থেকে ২০ গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের বেতন স্কেল অবিলম্বে ঘোষণার প্রত্যয়ে কতিপয় সুপারিশ করছি। যেমন-

১. পে কমিশন গঠনপূর্বক ৯ম পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে হবে। পে-স্কেল বাস্তবায়নের পূর্বে অন্তবর্তীকালীন কর্মচারীদের জন্য ৫০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা প্রদান করতে হবে। 
২. রেশনিং পদ্ধতি চালুসহ ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা অনুযায়ী ১০ ধাপে বেতন স্কেল নির্ধারণ করতে হবে। 
৩. সচিবালয়ের ন্যায় সকল দপ্তর/অধিদপ্তরের পদ নাম পরিবর্তনসহ ১০ম গ্রেডে উন্নীতকরণ এবং একই অভিন্ন নিয়োগ প্রণয়ন করতে হবে। 
৪. টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড পূর্ণবহালসহ বেতন জ্যেষ্ঠতা পূনঃবহাল বিদ্যমান গ্রাচুইটি/ আনুতোষিকের হার ৯০ শতাংশ এর স্থলে ১০০ শতাংশ নির্ধারণ ও পেনশন গ্রাচুইটি ১ টাকার সমান ৫০০ টাকা নির্ধারণ করতে হবে।
৫. সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের আপিল বিভাগের রায় বাস্তবায়নসহ সহকারি শিক্ষকদের বেতন নিয়োগবিধি ২০১৯ এর ভিত্তিতে ১০ম গ্রেডে উন্নতিকরণ ও অধস্তন আদালতের কর্মচারীদের বিচার বিভাগীয় সহায়ক কর্মচারী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
৬. প্রাথমিক শিক্ষার দপ্তরি কাম প্রহরীসহ আউটসোর্সিং পদ্ধতি বাতিলপূর্বক উক্ত পদ্ধতিতে নিয়োগকৃত ও উন্নয়ন খাতের কর্মচারীদের রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করতে হবে। ব্লক পোস্টে কর্মরত কর্মচারীসহ সব পদে কর্মরতদের পদোন্নতি বা ৫ বছর পর পর বেতন স্কেলের উচ্চতার গ্রেড প্রদান করতে হবে।
৭. বাজার মূল্যের ঊর্ধ্বগতির ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সমন্বয়পূর্বক সকল ভাতা দিয়ে পূনঃনির্ধারণ করতে হবে। চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর ও অবসরের বয়সসীমা ৬২ বছর নির্ধারণ করতে হবে।
সরকারি, অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীসহ দপ্তরি কাম প্রহরীদের সমস্যা নিরসন হোক। এ প্রত্যাশায়।

লেখক: সভাপতি, বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষা গবেষণা পরিষদ

জনপ্রিয়