ঢাকা রোববার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪ , ৩০ চৈত্র ১৪৩০ আর্কাইভস ই পেপার

nogod
nogod
bkash
bkash
uttoron
uttoron
Rocket
Rocket
nogod
nogod
bkash
bkash

তারুণ্যের রাজনীতির ভবিষ্যৎ

মতামত

এম. আবুল ফয়েজ মামুন

প্রকাশিত: ০০:১০, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

সর্বশেষ

তারুণ্যের রাজনীতির ভবিষ্যৎ

রাজনীতি হলো মানুষের জন্য কিছু করা। আর সে কিছু করার রাজনীতির প্রথম ধাপ হচ্ছে ছাত্র রাজনীতি। আর ছাত্র রাজনীতিতে জড়িত আছেন তরুণেরা। ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে তরুণেরা জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। বাংলা সাহিত্যে অনেক কবি-সাহিত্যিকই তারুণ্যের জয়গান গেয়েছেন। তারা বলেছেন, তরুণরা জরাগ্রস্ততায় ভোগে না। এ জরা শুধু দৈহিক নয়, মনস্তাত্ত্বিকও। তরুণেরা সতেজ। সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী। তরুণেরা সাহসী, উদ্ভাবনী চিন্তা থাকে তাদের মধ্যে। ফলে অসুরকে তাড়িয়ে সুরের প্রতিষ্ঠা করেন তারা। 

গত শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এ দেশের ছাত্র আন্দোলন ও গণ-আন্দোলন বিশেষ করে ভাষা আন্দোলনের মতো আন্দোলনে তরুণেরাই নেতৃত্বে ছিলো। কারণ, তরুণেরা ছিলো নির্লোভ-নির্ভয় দেশপ্রেমিক। তারুণ্যের শক্তিকে খ্রিষ্টপূর্ব যুগে চীনে কনফুসিয়াস আর গ্রিসে দার্শনিক সক্রেটিস ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন। তারা তরুণদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার পথ দেখাতে চেয়েছিলেন। বুঝেছিলেন, তারুণ্যের শক্তি ছাড়া সুস্থ জীবন আর রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না। তাই অন্যায়কারী গ্রিসের রাজা ও অভিজাতরা অনুভব করেন তারুণ্যের এ উত্থান তাদের অচলায়তন ভেঙে ফেলবে। এ কারণে মৃত্যদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিলো সক্রেটিসকে। আজ এতোকাল পর কী দেখছি আমরা? আমাদের দেশে তারুণ্যের দাপুটে অংশকে সুবিধাবাদী রাজনীতিকরা নিজেদের কায়েমি স্বার্থ হাসিলের জন্য অন্ধকারের গহ্বরে তলিয়ে যাওয়ার পথ দেখাচ্ছে। গত শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার কেন্দ্র হিসেবে নিজের অবস্থানকে চিহ্নিত করতে পেরেছিলো। একইসঙ্গে গৌরবজনক প্রতিবাদী আন্দোলনের চারণভূমি হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। অবশ্য তখন পরিপ্রেক্ষিতও ছিলো আলাদা। স্বাধীন পাকিস্তানে পরাধীন হয়ে পড়েছিলো বাঙালি। তাই মুক্তবুদ্ধি চর্চাকেন্দ্র কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থ-ভাবনাকে মনে জায়গা দেননি। দেশাত্মবোধে উদ্দীপ্ত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন স্বাধিকারের আন্দোলনে। আইয়ুব খান এনএসএফ তৈরি করে এ সুন্দর পরিমণ্ডলকে বিষাক্ত করতে চেয়েছিলেন। রক্তক্ষরণ হয়েছে, কিন্তু সার্বিকভাবে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে সুবিধাবাদের বীজ বপন করে বৈপ্লবিক চেতনাকে নিবীর্য করে দিতে পারেনি। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, আইয়ুব খানের আরাধ্য কাজ সুচারুভাবে বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখলো স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষমতা পিয়াসী রাজনৈতিক দলগুলো। স্বাধীনতা অর্জনের মধ্যদিয়ে বৈপ্লবিক আন্দোলনের প্রয়োজন অনেকটা ফুরিয়ে গেছে, কিন্তু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারে সচেতন মানুষগুলোর নির্মোহ রাজনৈতিক চেতনা হারিয়ে যাওয়ার কথা নয়। শিক্ষার অধিকার, সামাজিক অধিকার, সুস্থ রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ সব ক্ষেত্রে আন্দোলনে ভূমিকা রাখার কথা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসহ সকল তরুণদের। 

একমাত্র নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন ছাড়া স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ভুবন তেমন কোনো আন্দোলনে নিজেকে যুক্ত করতে পারেনি। সর্বশেষ ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ও কোটা সংস্কার আন্দোলনে তরুণ ও ছাত্ররা ভূমিকা রেখেছে। দেশে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের মোহগ্রস্ত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা বেড়েছে। দলীয় সুবিধাবাদ প্রতিষ্ঠায় এসব দলের ক্রীড়নকেরা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণদের মোহমুক্ত ঐক্যবদ্ধ শক্তির সম্ভাবনার জায়গাটিকে ভেঙেচুরে লন্ডভন্ড করে দেয়। দলীয় রাজনীতির আস্তাবল বানাতে থাকে। কিন্তু মুক্তবুদ্ধির চর্চাকেন্দ্রকে এভাবে দলিত-মথিত করা কঠিন। মোহগ্রস্ত করে ছাত্র ও তরুণদের একটি বড় অংশকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্যাম্পাসে তাদের লেজুড় সংগঠন পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে এসব লেজুড় সংগঠনগুলোর ক্ষমতার উত্থান-পতন ঘটতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই মূল দলের ইঙ্গিতে ছাত্র সংগঠনের ছাত্ররা উন্মত্ত আচরণ করতে থাকে। শিক্ষার কল্যাণের বদলে মূল দলের নির্দেশ পালনেই ব্যস্ত থাকে। এ আসুরিক পরিবেশে নিজেদের গুটিয়ে নেয় মেধাবী মুক্তচিন্তার তরুণ শিক্ষার্থীরা। সংখ্যায় সিংহভাগ হলেও এরা একাকী হয়ে যায়। তরুণদের রাজনীতি বিমুখতা কোন পথে নিয়ে যাবে আমাদের ভবিষ্যৎকে? এর সহজ জবাব হলো এক প্রতিবাদহীন মেনে নেয়া বা মানিয়ে নেয়ার সমাজের দিকে নিয়ে যাবে বাংলাদেশকে। মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশে তারুণ্যকে সুপথে পরিচালনা করার সুযোগ ছিলো।

রাজনৈতিক অঙ্গন ছাড়াও আশির দশক পর্যন্ত থানা ও জেলা থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো ছিলো সক্রিয়। এ সংগঠনগুলো ঘিরে তরুণদের নান্দনিক চিন্তা ও দেশাত্মবোধ জাগিয়ে তোলার একটি পথ তৈরি হয়েছিলো কিন্তু ধীরে ধীরে রাজনীতিতে বিবদমান দলের অস্তিরতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। যুক্তি বুদ্ধির রাজনীতি ক্ষমতার রাজনীতিতে এসে নিজের গৌরব হারিয়ে ফেলে। গণতন্ত্র চর্চার চেয়ে শক্তির চর্চা বেশি হতে থাকে। এ পথে তারুণ্যের একটি সরব অংশ অশুভ রাজনীতিকদের ক্রীড়নকে পরিণত হতে থাকে। গেলো জাতীয় দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থক তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রায় সারা দেশে চোরাগোপ্তা বা প্রকাশ্য মিছিল নিয়ে, পুলিশের ওপর হামলা করেছে। গাড়ি ভেঙেছে, আগুন দিয়েছে। তাদের লক্ষ্য ছিলো নির্বাচন বানচাল করা। তাই দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিঘ্নিত করার জন্য তৈরি করতে চেয়েছিলো অরাজক অবস্থা। সুস্থ মেধায় ভাবলে এ দেশের বাঙালি তরুণের এ কাজ করার কথা ছিলো না। অর্থ আর অস্ত্র শক্তিতে বলীয়ান করে অমানবিক বানানো হয়েছে। যে তরুণদের সুন্দর আর ন্যায়ের পক্ষে থাকার কথা, দেশাত্মবোধে উদ্দীপ্ত হওয়ার কথা তারা ঘোর অন্ধকারে নিপতিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী, পাকিস্তানি হানাদারদের বাঙালি হত্যা, সম্পদ ধ্বংসকারী ও নারী ধর্ষণে সহযোগী কতিপয় মানুষকে রক্ষা করতে অধর্ম ও অমানবিক কাজ করেছে। 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি যুক্তিবুদ্ধিহীন কলুষিত না হলে তারুণ্যের এ পরাজয় সর্বত্র দেখতে হতো না। ফর্মুলায় আটকে থেকে কেউ কেউ বলে বেড়ান, ভবিষ্যৎ রাজনীতির শূন্যতা পূরণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি অবশ্যই থাকা উচিত। একইসঙ্গে তারা সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার এবং স্বাধীনতা-পূর্ব উজ্জ্বল ছাত্র রাজনীতির উদাহরণও দাঁড় করান। তাদের কী করে বোঝাই-ছাত্র রাজনীতি আর বর্তমান ধারার লেজুড়বৃত্তি ছাত্র রাজনীতি এক কথা নয়। যার যার দলীয় আদর্শ ধারণ করা বা তা বাস্তবায়নে দোষের কিছু নেই সত্য। সংকট তখনই হয়, যখন দলীয় সমর্থনে রাজনীতি চর্চার বদলে দলীয় লাঠিয়ালে পরিণত হয় তারুণ্য। এরা গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ বুঝতে চায় না। মূল দলের নেতৃত্বের মতো এরাও পরমতসহিষ্ণুতাকে পরিত্যাজ্য ঘোষণা করে। মূলদল যেমন কপটতার আশ্রয় নিয়ে বলতে থাকে, ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। সেদিক থেকে লেজুড় ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছাত্ররা কপটতা না করে প্রভুদের ইচ্ছানুযায়ী ব্যক্তিবন্দনাই করে। তাই এরা স্লোগানের ক্রমবিকাশ ঘটিয়ে ক্যাম্পাসে নিজেদের পরিচয় দেয় অমুক ভাইয়ের সৈনিক হিসেবে। এ কারণে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতিতে যুক্ত তারুণ্য সাধারণ মানুষের তো নয়ই, নিজ রাজনৈতিক দলের আদর্শেরও সৈনিক হতে পারে না। মূল দলের ইচ্ছা পূরণের জন্য ক্যাম্পাসে দখলদারিত্ব বজায় রাখাটা প্রধান কাজ হিসেবে মনে করে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসার পাশাপাশি ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধে যুক্ত থেকে তারুণ্যের আদর্শিক ও নৈতিক মনোভূমিকে অনুর্বর করে ফেলে। তাই তারুণ্যের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের ভাবনার সময় এসেছে। আর যদি আমরা না ভাবি, তাহলে তারুণ্যের রাজনীতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার হওয়ার জন্য আমরা দায়ী থাকবো।

লেখক: কলামিস্ট ও গবেষক

জনপ্রিয়