ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪ , ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ আর্কাইভস ই পেপার

nogod
nogod
bkash
bkash
uttoron
uttoron
Rocket
Rocket
nogod
nogod
bkash
bkash

শিক্ষকরা কেনো আত্মঘাতী!

মতামত

মাছুম বিল্লাহ

প্রকাশিত: ০০:০০, ১৯ এপ্রিল ২০২৪

সর্বশেষ

শিক্ষকরা কেনো আত্মঘাতী!

যুক্তরাজ্যের ‘দ্য গার্ডিয়ান’সহ বেশ কয়েকটি বিখ্যাত সংবাদপত্রে একটি সংবাদ ছাপা হয়েছে, যেটি শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বের শিক্ষকদের দৃষ্টি কাড়ার কথা। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশে শিক্ষকরা উন্নত বিশ্বের শিক্ষকদের বেতন, সুবিধাদি ও জীবনযাপন অনেক উন্নত মানের। তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যন্ত সুস্থ ও সুন্দর জীবনযাপন করছেন বলে মনে করেন। তাদের জন্য সংবাদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

গত ৩১ মার্চ ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব স্কুলমাস্টার্স ইউনিয়ন অব উইমেন টিচার্স (এনএএসইউডব্লিউটি) নামের একটি শিক্ষক সংগঠন উত্তর ইয়র্কশায়ারের হ্যারোগেটে তাদের বার্ষিক সম্মেলন করে। সেখানে শিক্ষকদের জীবনের করুণ অবস্থা, পরিণতি এবং করণীয় নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অনেক প্রতিনিধি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। কনফারেন্সে প্রতিনিধিরা বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত শিক্ষকদের অভিজ্ঞতার কথা শুনছিলেন। একজন শিক্ষিকা বলছেন, ‘আমার দুই শিক্ষক বন্ধু তাদের জীবন আত্মাহুতি দিয়েছেন। কারণ, তাদের রাগ ছিলো, দুঃখ ছিলো এবং কেনো তা করেছে তা জানার চেষ্ট করেছি। আমরা কি করতে পারতাম শিক্ষক হিসেবে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এতো দুঃখজনক যা আজকে বর্ণনা করতে পারছি না।’

তিনি আরো বলেন, ‘রুথ পেরি নামের একজন প্রধান শিক্ষিকা আত্মহত্যা করেছেন। তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, তার বিদ্যালয় সেভগার্ডিং বিষয়ে উচ্চতম গ্রেডে অবস্থান করছিলো, সেখান থেকে গ্রেডিং নিম্নতম পর্যায়ে পৌঁছেছিলো। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকজন শিক্ষকদের আত্মহত্যার কথা বলা হয়েছে, যে কথা আমরা বলতে পারছি না, কিন্তু বলতে হচ্ছে। অত্যন্ত সংবেদনশীল আমাদের পেশার বিষয়। তবে আমরা আর আত্মহত্যা দেখতে চাই না।’ 

শিক্ষক ইউনিয়নটি জানিয়েছে, শিক্ষকদের পেশাগত চাপই তাদেরকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গত বছরের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্রিটেনের স্কুলগুলোতে প্রতি পাঁচজন শিক্ষকের মধ্যে চারজনই মারাত্মক মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন। 

শিক্ষক সংগঠনটির বার্ষিক সার্ভেতে দেখা যায়, ১১ হাজার ৭৫২ জন সদস্য বলেছেন, ৮৬ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন তাদের চাকরি গত ১২ মাস ধরে তাদের মানসিক স্বাস্থের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে, বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। একজন শিক্ষক বলেছেন, ‘আমার শরীর ও মানসিক এনার্জি লেভেল কখনই এতো নিম্নে ছিলো না এখন যে অবস্থায় আছে। আমি এর পূর্বে কখনই এতো উদ্বিগ্ন ছিলাম না এবং আমার আত্মবিশ্বাস এতো কম কখনই ছিলো না।’ 

আর একজন শিক্ষক বলেছেন, ‘শিক্ষকতায় আনন্দের পরিবর্তে মনে হয় সারা দিনই টেনশনে কেটে যায়। প্রায় ২৩ শতাংশ শিক্ষক তাদের অ্যালকোহল গ্রহণের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছেন শুধু কাজের চাপের কারণে। আর ১২ শতাংশ শিক্ষক ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য অ্যান্টিডিপ্রেশন ওষুধ সেবন করছেন কিংবা অন্য কোনো পন্থা অবলম্বন করছেন।’ সংগঠনটির জেনারেল সেক্রেটারি পেট্রিক রোচ বলছেন, ‘কাউকেই তার কাজের জন্য, তার চাকরির কারণে  জীবন শেষ করে দেয়ার মতো অবস্থায় যেতে দেয়া ঠিক নয়।

শিক্ষকদের স্বাস্থ্যের অবস্থা অধিকতর খারাপ হয়েছে। এটি স্পষ্ট, আরো উন্নতমানের সহযোগিতা প্রয়োজন আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যাতে শিক্ষকেরা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা ঠিক রাখতে পারেন। বহু সংখ্যক শিক্ষক তাদের স্বাস্থ্য ভেঙে ফেলেছেন এই পেশায় চাপের কারণে এবং অনেকেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের আশায় শিক্ষকতা চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন। সরকারের কাছে আমাদের দাবি হচ্ছে, শিক্ষকেরা যাতে ভারোভাবে বেঁচে থাকতে পারেন। বেঁচে থাকার জন্য যাতে শুধু সংগ্রামেই সময় কাটাতে না হয়।’

এতো গেলো যুক্তরাজ্যের প্রেক্ষাপট। এক্ষেত্রে আমাদের দেশের কী অবস্থা? একটি বেসরকারি সংস্থা ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে এ বছরের ২৭ জানুয়ারি। ওই সমীক্ষায়  জানানো হয়, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দে সারা দেশে মোট ৫১৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তাদের মধ্যে স্কুল পড়ুয়া ২২৭ জন, কলেজ শিক্ষার্থী ১৪০ জন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ৯৮ জন ও মাদরাসা শিক্ষার্থী ৪৮ জন। ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা বেশি আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যা করা মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ২০৪ জন,  ছাত্রী ৩০৯ জন। ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী ৩৪১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।

এমন পরিসংখ্যানে আরো কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হচ্ছে। তার মধ্যে একটি হলো- ইয়ংদের মধ্যে আবেগ বেশি থাকে, তাই তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতাও বেশি দেখা যাচ্ছে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, নারীদের মধ্যে আবেগের প্রবণতা বেশি, তাই আত্মহত্যার দিক দিয়েও তাদের সংখ্যাটিই ওপরে। স্কুল শিক্ষার্থীদের চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়ারা বেশি বাস্তববাদী ,তাই তাদের মধ্যে এ হার কম। কিন্তু শিক্ষকদের আত্মহত্যার কোনো কথা ওই প্রতিবেদনে নেই। তার মানে কি শিক্ষকদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেনি? বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিচিছন্নভাবে কিছু শিক্ষকের আত্মহত্যার কথা আমরা জেনেছি। শিক্ষকদের বিভিন্ন চাপের কথা আমাদের অজানা নয়। 

যুক্তরাজ্যের শিক্ষক সংগঠনটি স্কুল শিক্ষকদের আত্মহত্যা প্রতিরোধে রাষ্ট্রের কাছে প্রশিক্ষণ আয়োজনের দাবি জানিয়েছে। শিক্ষকেরা মারাত্মক মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিয়ে রয়েছেন। কনফারেন্সে স্কুল ও কলেজগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানের প্রশিক্ষিত স্টাফ সরবরাহের দাবি জানানো হয়। এর সঙ্গে পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণের দাবি জানানো হয়।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে সচেতনতা বিষয়ক সভা সেমিনার বেশি বেশি করার ও শিক্ষকদেরকে চাপমুক্ত রেখে সঠিক পরিবেশে শিক্ষাদানের পরিবেশ সৃষ্টির কথাও আলোচনা হয়েছে। তার মানে হচ্ছে, শিক্ষকদের মানসিক অবস্থা ধনী-গরিব, উন্নত-অনুন্নত কোনো  দেশেই খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই। এনএএসইউডব্লিউটি-এর বার্ষিক কনফারেন্স তাই বলছে। আমারও বেশ কয়েকটি দেশে (উন্নত ও অনুন্নত) শিক্ষকদের অবস্থা সরেজমিনে দেখার সুযোগ হয়েছে। অবস্থা কোথাওই খুব একটা ভালো নয়।  

জনপ্রিয়